সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: দিরাইয়ের দুরন্ত ছেলেটি যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন ‘ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ’
মুহতাসিম মাহমুদ: সিলেট অঞ্চলের রাজনীতি ও ইতিহাসের আলোচনায় কিছু নাম শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে আটকে থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আনোয়ারপুর গ্রামের সন্তান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী এবং সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আর মানুষের ভালোবাসায় পেয়েছিলেন ‘ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ’ ও ‘সংসদীয় রাজনীতির কবি’সহ নানা পরিচয়।
১৯৪৫ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্ম সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন দুরন্ত স্বভাবের। পড়াশোনার চেয়ে গ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নাটক ও যাত্রাপালার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, স্কুলজীবনে মেট্রিক পরীক্ষায় তিনবার ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। চতুর্থবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন সিলেটের এমসি কলেজে। এরপর সেই দুরন্ত ছেলেটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন।
ছোটবেলায় যাত্রাপালার মঞ্চে অভিনয় করা সেই কিশোরের কণ্ঠই একদিন জাতীয় সংসদে হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ। তাঁর বক্তৃতায় যেমন ছিল তীক্ষ্ণ যুক্তি, তেমনি ছিল রসবোধ ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য। সংসদে গুরুতর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনার মধ্যেও তাঁর বক্তব্যে প্রাণ ফিরে আসত। এ কারণেই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর বক্তৃতার ধরন আলাদা করে স্মরণ করা হয়।
ছাত্রজীবন থেকেই সুরঞ্জিত যুক্ত হন বামপন্থী রাজনীতিতে। পরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ন্যাপের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ওই ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে ন্যাপের একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রক্রিয়ায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক অধ্যায়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও সরাসরি অংশ নেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি সিলেট অঞ্চলের ৫ নম্বর সেক্টরের টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামেও তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল।
স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর পথচলা আরও দীর্ঘ হয়। দিরাই ও শাল্লার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘সেনদা’ বা আপনজনের মতো এক রাজনৈতিক নেতা। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষকের সমস্যা, যোগাযোগব্যবস্থা ও এলাকার উন্নয়ন নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কথা বলেছেন। ছোট একটি রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে জাতীয় সংসদের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হওয়ায় তাঁর পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘ছোট দলের বড় নেতা’ হিসেবে।
পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় সুনামগঞ্জ-২ আসনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। ২০১১ সালে দেশের প্রথম রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে মন্ত্রিত্ব ছাড়েন এবং পরবর্তীতে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। রেলমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর গাড়িতে বিপুল অর্থ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর পর তিনি রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রশংসা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমালোচনা ও বিতর্কও।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সংসদীয় রাজনীতিতে। সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান এবং বক্তব্যের স্বতন্ত্র ধরন তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেও রসবোধ দিয়ে পরিবেশ সহজ করে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। এ কারণেই তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁকে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম স্মরণীয় বক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় সম্ভবত তাঁর শেষ বিদায়ের গল্প।
তিনি দিরাইয়ের নিজ বাড়ির আঙিনায় দুটি চন্দনগাছ লাগিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন চন্দনকাঠ দিয়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জন্মভূমি আনোয়ারপুরে। সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর মরদেহ পৌঁছায় দিরাইয়ের বাড়িতে। হাজারো মানুষ সেখানে শেষবারের মতো তাঁদের প্রিয় নেতাকে দেখতে জড়ো হন।
সন্ধ্যায় আনোয়ারপুরেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। আর তখন বাস্তব হয়ে ওঠে তাঁর রেখে যাওয়া সেই শেষ ইচ্ছা। নিজের হাতে লাগানো দুটি চন্দনগাছের কাঠ কেটে তাঁর দাহকাজে ব্যবহার করা হয়। গাছের কাঠে পর্যাপ্ততা না থাকায় ঢাকা থেকেও অতিরিক্ত চন্দনকাঠ আনা হয়েছিল।
জীবনের শুরু হয়েছিল আনোয়ারপুরের মাটি থেকে। রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন জাতীয় সংসদের সর্বোচ্চ আলোচনার কেন্দ্রে। আর শেষ বিদায়ও হলো সেই জন্মভূমির মাটিতেই, নিজের হাতে লাগানো গাছের কাঠের আগুনে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন তাই শুধু একজন রাজনীতিবিদের জীবনী নয়। এটি এক দুরন্ত গ্রামের ছেলের অসম্ভব এক পথচলার গল্প। যে ছেলে পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছিল, যাত্রাপালার মঞ্চে অভিনয় করেছিল, সেই ছেলেই একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত হলেন, মুক্তিযুদ্ধে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করলেন, সাতবার সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করলেন এবং বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নিজের আলাদা একটি অধ্যায় তৈরি করলেন।
আজ তিনি নেই। নেই তাঁর সেই তীক্ষ্ণ বক্তব্য, নেই সংসদে তাঁর রসিকতা, নেই রাজনৈতিক মঞ্চে সেই পরিচিত কণ্ঠ। কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের হাওরপাড়ের মানুষের স্মৃতিতে তিনি এখনও জীবন্ত।
আনোয়ারপুরের মাটি তাঁর জন্মের সাক্ষী। দিরাইয়ের মানুষ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সাক্ষী। আর সেই চন্দনগাছের গল্প আজও মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন কখনো কখনো নিজের শুরুতেই ফিরে আসে শেষ অধ্যায়ে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত চলে গেছেন, কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর বর্ণিল জীবনকথা থেকে গেছে এক দীর্ঘ স্মৃতি হয়ে।
লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.