ব্রিটেনে বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস: বাসায় ৩ দিনের জরুরি পণ্য মজুতের পরামর্শ
ব্রিটেনে সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে আগেভাগে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে সরকার। চরম আবহাওয়া, বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিপর্যয়সহ বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিবারগুলোকে অন্তত কয়েক দিনের মৌলিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দেশটি কি বড় কোনো দুর্যোগ বা সংকটের আশঙ্কা করছে? তবে সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ, হামলা বা দুর্যোগ আসন্ন হওয়ার ঘোষণা নয়। বরং সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েক দিন যেন পরিবারগুলো নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন সামলাতে পারে, সে লক্ষ্যেই জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় প্রস্তুতি নিয়ে নতুন প্রচারণা
যুক্তরাজ্য সরকার চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক একটি ‘ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স’ বা জাতীয় দুর্যোগ-প্রস্তুতি প্রচারণা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চরম আবহাওয়া কিংবা সাইবার হামলার কারণে বিদ্যুৎ, পানি, মোবাইল নেটওয়ার্ক বা স্থানীয় দোকানপাটে প্রবেশাধিকার ব্যাহত হলেও সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রস্তুত থাকবে, সে বিষয়ে জনগণকে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া হবে।
সরকারের ধারণা, জরুরি পরিস্থিতির প্রথম কয়েক দিন মানুষ যদি নিজেদের খাবার, পানি, ওষুধ ও যোগাযোগের মৌলিক প্রয়োজন নিজেরাই সামলাতে পারে, তাহলে জরুরি সেবাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত সহায়তা করার সুযোগ পাবে।
ঘরে কী কী রাখার পরামর্শ?
সরকারি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত নির্দেশনা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জরুরি প্রস্তুতি গাইডলাইনে পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
অন্তত তিন দিনের নষ্ট না হওয়া খাবার পর্যাপ্ত পানীয় পানি টর্চ ও অতিরিক্ত ব্যাটারি ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো রেডিও মোবাইল ফোনের পাওয়ার ব্যাংক প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ভেজা টিস্যু শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পোষা প্রাণীর খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত বের হওয়ার জন্য একটি ‘গ্র্যাব ব্যাগ’।যুক্তরাজ্যের ২০২৬ সালের জাতীয় প্রস্তুতি জরিপেও তিন দিনের জরুরি খাদ্য ও পানির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জরিপে তিন দিনের জন্য নষ্ট না হওয়া, রান্নার প্রয়োজন নেই এমন খাবার এবং প্রতি ব্যক্তির জন্য অন্তত ৯ লিটার বোতলজাত পানির মজুত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে।
পানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব
জরুরি পরিস্থিতিতে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হতে পারে নিরাপদ পানীয় পানির সংকট।
সরকারি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় একজন মানুষের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানীয় পানি ধরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিন দিনের জন্য একজনের ক্ষেত্রে অন্তত ৭.৫ থেকে ৯ লিটার পানীয় পানি প্রয়োজন হতে পারে।
পরিবারে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা পোষা প্রাণী থাকলে প্রয়োজন আরও বেশি হতে পারে।
২০২৬ সালের সরকারি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের কাছে তিন দিনের জন্য পর্যাপ্ত বোতলজাত পানি রয়েছে। প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ৩ লিটার হিসেবে হিসাব করলে মাত্র ৪ শতাংশ পরিবারের কাছে তিন বা তার বেশি দিনের প্রয়োজন মেটানোর মতো বোতলজাত পানি ছিল।
অন্যদিকে, ৬০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তাদের কাছে প্রায় তিন দিনের জন্য নষ্ট না হওয়া খাবার রয়েছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে কী হবে?
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়টিও সরকারের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকলে আলো, মোবাইল ফোন চার্জ, ইন্টারনেট, রান্না ও অনেক ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ঘরে ব্যাটারি চালিত বা হাত ঘুরিয়ে চালানো টর্চ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মোমবাতির পরিবর্তে টর্চকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক এবং অতিরিক্ত ব্যাটারি রাখার পরামর্শ রয়েছে।
ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে
জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট পরিষেবাও বিঘ্নিত হতে পারে।
এ কারণে ব্যাটারি চালিত বা হাত ঘুরিয়ে চালানো রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সতর্কবার্তা ও স্থানীয় পরিস্থিতির খবর পাওয়ার ক্ষেত্রে রেডিও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বরগুলো শুধু মোবাইলে না রেখে কাগজেও লিখে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কোথায় মিলিত হবেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে কোন পথে যাবেন, সেটিও আগে থেকে ঠিক করে রাখার পরামর্শ রয়েছে।
খাবারের ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই
সরকারের প্রস্তুতি বার্তার অর্থ বিপুল পরিমাণ খাবার কিনে ঘরে জমিয়ে রাখা নয়।
বরং পরিবারে নিয়মিত খাওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার কয়েক দিনের জন্য আলাদা করে রাখাই বাস্তবসম্মত।
যেমন—
টিনজাত মাছ টিনজাত বিনস টিনজাত ফল ও সবজি টিনজাত স্যুপ বিস্কুট ও ক্র্যাকার সিরিয়াল সিরিয়াল বার বাদামের মাখন শুকনো ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য দুধ প্রস্তুত খাবার।টিনজাত খাবার রাখলে সেটি খোলার জন্য টিন ওপেনারও রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে রান্নার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই জরুরি খাদ্যভাণ্ডারে এমন খাবার থাকা ভালো, যা সরাসরি খাওয়া যায় বা খুব সামান্য প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
শিশু ও পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা প্রস্তুতি
শিশু থাকা পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। কয়েক দিনের জন্য ডায়াপার, শিশুখাদ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী হাতে রাখা উচিত।
একইভাবে পোষা প্রাণীর খাবারও কয়েক দিনের জন্য মজুত রাখার পরামর্শ রয়েছে।
জরুরি অবস্থায় দোকান বন্ধ থাকলে কিংবা বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে এসব সামগ্রী সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারকারীদের জন্য সতর্কতা
যারা নিয়মিত প্রেসক্রিপশন ওষুধ ব্যবহার করেন, তাদের জন্য কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় ওষুধ আগে থেকেই হাতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ওষুধের নাম, ডোজ এবং চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা কাগজে লিখে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যাটারিতে চলে, সেগুলোর অতিরিক্ত ব্যাটারি বা চার্জের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ রয়েছে।
বাড়ির বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বাড়ি ছাড়তে হলে একটি প্রস্তুত ‘গ্র্যাব ব্যাগ’ কাজে আসতে পারে।
এতে রাখা যেতে পারে—
টর্চ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মোবাইল চার্জার বা পাওয়ার ব্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি, অতিরিক্ত চশমা, কিছু নগদ অর্থ, পানি, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, প্রয়োজনীয় পোশাক এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী।
তবে আগুন বা অন্য কোনো তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে ব্যাগ বা অন্য কোনো সামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়িতেও রাখতে বলা হচ্ছে জরুরি সামগ্রী
গাড়ি ব্যবহারকারীদেরও কিছু জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ রয়েছে।
এর মধ্যে থাকতে পারে টর্চ, মোবাইল চার্জার, অতিরিক্ত গরম কাপড়, কম্বল, খাবার ও পানি, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স এবং গাড়ির ব্যাটারি চালুর তার।
তবে ভয়াবহ আবহাওয়া বা বন্যার সময় গাড়ি ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হলে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাহলে কি ব্রিটেনে বড় দুর্যোগ আসছে?
সরকারের প্রস্তুতি কর্মসূচি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত এটিকে কোনো নির্দিষ্ট বড় দুর্যোগ বা যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কারণ নেই।
বরং ব্রিটিশ সরকারের বর্তমান অবস্থান হলো, আধুনিক বিশ্বে একাধিক ঝুঁকি একই সময়ে তৈরি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়া, বন্যা ও তাপপ্রবাহের পাশাপাশি সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের মতো ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
সরকারি প্রস্তুতি কর্মসূচির মূল লক্ষ্য তাই আতঙ্ক তৈরি করা নয়, বরং সাধারণ মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা।
প্রস্তুতিতে ব্রিটিশদের অংশগ্রহণ কতটা?
২০২৬ সালের সরকারি জরিপে দেখা গেছে, তিন দিনের নষ্ট না হওয়া খাবার রাখার ক্ষেত্রে মানুষের প্রস্তুতি তুলনামূলক ভালো হলেও পানির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের কাছে অন্তত তিন দিনের নষ্ট না হওয়া খাবার রয়েছে। কিন্তু তিন দিনের প্রয়োজন মেটানোর মতো পানির মজুত রয়েছে এমন পরিবারের হার অনেক কম।
এটি থেকেই বোঝা যায়, সরকারের নতুন প্রচারণার অন্যতম লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে শুধু খাবার নয়, পানি, ওষুধ, যোগাযোগ ও পারিবারিক জরুরি পরিকল্পনা সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো।
সরকারের মূল বার্তা: আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি
ব্রিটিশ সরকারের বার্তাটি মূলত সহজ—কোনো সংকট আসার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই কিছু মৌলিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা।
একটি পরিবার যদি কয়েক দিনের খাবার ও পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, আলো, যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখে, তাহলে বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের প্রথম ধাক্কা সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে সরকারের এই উদ্যোগকে কোনো নির্দিষ্ট হামলা বা দুর্যোগ আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক জাতীয় দুর্যোগ-সহনশীলতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ সরকার, যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট, ২০২৬ সালের UK Public Survey of Risk Perception, Resilience and Preparedness এবং বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জরুরি প্রস্তুতি নির্দেশনা।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.