নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় মৃত প্রায় ৪০০, নিখোঁজ ১ হাজার ৪০০-এর বেশি

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০১ (শুক্রবার)
নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় মৃত প্রায় ৪০০, নিখোঁজ ১ হাজার ৪০০-এর বেশি

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই বন্যার ধ্বংসস্তূপে তৈরি দুটি হ্রদের পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বুধবার নেপালের ভোতে কোশি নদী ও এর আশপাশের এলাকায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। প্রবল স্রোতে পানি, কাদা, পাথর ও বরফ পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সীমান্ত অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়। নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ বেশ কয়েকটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি চিতওয়ানসহ নিচু এলাকার দিকেও প্রবাহিত হয়ে বহু দূর পর্যন্ত মরদেহ ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গেছে।

নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা ৪৬৬। তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। নেপালের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৯১০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।

নেপালের পর্যটন বোর্ড ও সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের নাগরিক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, চীনের ১০০ জন, মালয়েশিয়ার ৫১ জন, ইউক্রেনের ৫৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৯ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপানসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। চীনের তিব্বতের গিরং এলাকায় বন্যা ও কাদাধসে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে সীমান্তবর্তী পর্যটন ও তীর্থযাত্রার রুটগুলোতে। অনেক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী কৈলাস-মানস সরোবর এলাকায় যাওয়ার পথে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। আকস্মিক বন্যায় তাদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে নেপালের বিভিন্ন সেনা ক্যাম্প, পুলিশ স্টেশন ও হাসপাতালে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালেও নিখোঁজদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরা ছুটে যাচ্ছেন, আহতদের তালিকা ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজছেন।

নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য জমা নেওয়া হচ্ছে। অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছে। কেউ স্বামীকে, কেউ সন্তানকে, কেউ ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়কে খুঁজছেন।

রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেলের কর্মীরাও বন্যার পর নিখোঁজ রয়েছেন। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে ৩৫ জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল তাদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে।

উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য এবং প্রায় দুই ডজন হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরই মধ্যে শত শত মানুষকে আকাশপথে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি। বন্যায় অন্তত ৩৫টি চলাচলযোগ্য সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নেপালের সরকারি সংস্থাগুলো জানিয়েছে। ফলে অনেক দুর্গম এলাকায় স্থলপথে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারছে না।

এর মধ্যেই নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যার প্রবল স্রোতে নদীর গতিপথে ধ্বংসাবশেষ জমে কয়েকটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সেখানে নতুন হ্রদ বা জলাধার সৃষ্টি হয়েছে এবং এসব জলাধারে দ্রুত পানি জমছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় তৈরি একটি হ্রদের পানি বাড়ছে এবং এটি ভেঙে পড়লে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা, উদ্ধারকর্মী, যাত্রী ও পর্যটকদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষও তিব্বত সীমান্তের একটি প্রাকৃতিক বাঁধে তৈরি হ্রদ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে আগামী কয়েক দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি প্রবাহ বাড়তে থাকলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসতে পারে। চলতি সপ্তাহে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফস্তরের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, একটি বড় বরফ ও পাথরের ধস নদীর ওপর আছড়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করে। তবে দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ ও এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বন্যায় পুরো জনপদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় অনেক মানুষ খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

নেপাল সরকার জানিয়েছে, উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রমে রাষ্ট্রীয় সব ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশও সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে আরও সময় লাগতে পারে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়াদের উদ্ধার এবং নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে নদী ও নতুন তৈরি হওয়া হ্রদগুলোর পানির স্তর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই দুর্যোগকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.