২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ২২ বছর: ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শহীদদের স্মরণ

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:৩৮ (শুক্রবার)
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ২২ বছর: ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শহীদদের স্মরণ

আজ ২১ আগস্ট। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর তৎকালীন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সমাবেশে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলা। আজ তার ২২তম বার্ষিকী।

সেদিন যা ঘটেছিল

সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে সেদিন বিকাল ৪টার আগেই কানায় কানায় ভরে ওঠে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে খোলা একটি ট্রাকে তৈরি মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। বিকাল ৫টার দিকে বুলেটপ্রুফ গাড়িতে সমাবেশস্থলে পৌঁছান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা তথা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতার পর, বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ট্রাক থেকে নামার সিঁড়ির দিকে এগোনোর মুহূর্তেই শুরু হয় একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা।

দলীয় নেতাকর্মী ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তাৎক্ষণিকভাবে মানববলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন বলে তৎকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। এতে তিনি প্রাণে বাঁচলেও গ্রেনেডের বিকট শব্দে তাঁর শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন, পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান, ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ আরও অনেকে। আহত হন পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে আজও ভুগছেন এবং কেউ কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

মামলা ও বিচারিক পরিণতি

এই হামলার ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি পৃথক মামলা দায়ের হয়। প্রাথমিক তদন্তের পর ২০০৭ সালে এক এগারোর পটপরিবর্তনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলা দুটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। ২০০৮ সালে সিআইডি দুই মামলায় ২২ জনকে আসামি করে পৃথক অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্রের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল১ মামলা দুটির রায় দেয়। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ আরও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বাকি ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য একই বছরের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়, পাশাপাশি কারাবন্দি আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।

তবে সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট একটি রায়ে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করে বিচারিক আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করে দেয়, যার ফলে মামলার সব আসামি খালাস পান। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণও দেওয়া হয়েছিল যে, নিহতদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশেষজ্ঞ সংস্থার মাধ্যমে নতুন করে সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপক্ষ এই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতভাবে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখে। রায়ে বলা হয়, তথ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনি দিক পর্যালোচনায় হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে কোনো দুর্বলতা বা বেআইনি কিছু পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি নতুন তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নথি পাঠানোর যে পর্যবেক্ষণ হাইকোর্ট দিয়েছিল, আপিল বিভাগ তাও প্রত্যাহার করে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পটপরিবর্তন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটে। সরকার পতনের সেই রাতেই বিক্ষুব্ধ জনতার পরিচয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন যা তখন স্মৃতি জাদুগড় তাতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। এরপর বাড়িটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার একটি ভাষণকে কেন্দ্র করে ফের বিক্ষোভ শুরু হয় এবং রাতভর এক্সকাভেটর ও বুলডোজার দিয়ে বাড়িটি সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই সময়ের মধ্যে ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটি ও এর সব অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়, বর্তমান নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতেও আর রাজনীতি করতে পারবে না।

এই ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেখানে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনের পাঁচ দিনের মাথায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জনসম্মুখে শপথ নিয়ে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি একসময় এই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। একই নির্বাচনে নেত্রকোণা৪ (মদনমোহনগঞ্জখালিয়াজুরী) আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, যিনি ২০১৮ সালের রায়ে এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে, দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে আজ পালিত হচ্ছে ২১ আগস্ট। যে মামলায় একদা মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের রায় হয়েছিল, উচ্চ আদালতের রায়ে সেই মামলার সব আসামি এখন আইনের চোখে খালাসপ্রাপ্ত। আর যে দল এই হামলার শিকার হয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগ আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনীতির বাইরে।

শেখ হাসিনার বিবৃতি

এই বার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি ২১ আগস্টের হামলাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই হামলার মধ্য দিয়েই ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনীতিতে সংঘাত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছিল। বিবৃতিতে তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা নির্মোহভাবে ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখে, অতীতে কারা রাষ্ট্রক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেছিল এবং কারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহিংস উপায়ে দমনের চেষ্টা করেছিল।

তিনি নিহত আইভি রহমানসহ সব শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানান। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে তিনি দাবি করেন, এর মধ্য দিয়ে যারা রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এসেছে তাদের মূল উদ্দেশ্য তাকে ও তার দলকে নিশ্চিহ্ন করা, এবং এর সপক্ষে তিনি ৫ আগস্টের পর দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মামলার অভিযোগ তুলে ধরেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকায় এবং দলীয় প্রধান হিসেবে তার অবস্থান নিয়ে চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই বিবৃতি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.