সাগর পথে ইতালিতে পাড়ি: ভূমধ্যসাগরে খাবার-পানির অভাবে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:১৮ (শুক্রবার)
সাগর পথে ইতালিতে পাড়ি: ভূমধ্যসাগরে খাবার-পানির অভাবে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ভয়াবহ চেষ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ বাংলাদেশি। লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকা ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রায় নয় থেকে ১০ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানির সংকটে থাকা যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে থাকা যাত্রীদের মধ্যে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিক মারা যান। পরে আরও একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। মৃতদের মরদেহে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় জীবিত যাত্রীরা সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

মিসরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উদ্ধার করা বাংলাদেশিদের মধ্যে ২৯ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন বা পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বলে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তবে স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ২৯ বা ৩০ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১০ বা ১১ জন বলা হয়েছে। নিহতদের সবার পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি আব্দুল করিম। তিনি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

আব্দুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিকসহ মোট ৪২ জন একটি রাবারের নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের বলা হয়েছিল, গ্রিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে।

নৌকাটি স্পিডবোটের একটি ইঞ্জিনে চলছিল। কিন্তু এতে প্রয়োজনীয় নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। একপর্যায়ে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে নৌকাটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সাগরে ভাসতে থাকে।

এ সময় তীব্র গরম, প্রচণ্ড রোদ, খাবার ও পানির সংকটে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। আব্দুল করিমের দাবি, তাদের চোখের সামনেই একের পর এক বাংলাদেশি অসুস্থ হয়ে মারা যান। পরে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরায় সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।

দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর বাতাস ও স্রোতের গতিপথে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। সেখানে মিসরীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জে স্বজনদের উদ্বেগ

ঘটনার পর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি পরিবারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ওই নৌযাত্রায় শান্তিগঞ্জের কয়েকজন তরুণ ছিলেন। তাদের মধ্যে পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম জীবিত উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

এ ছাড়া পাগলা শত্রুমর্দন এলাকার হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া, মামুন খান এবং রনসী গ্রামের মো. তালহাসহ কয়েকজন এখনো নিখোঁজ বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তবে তাদের মধ্যে কে নিহত হয়েছেন, আর কে নিখোঁজ রয়েছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে সুনামগঞ্জের সাতজন নিখোঁজ থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। আবার নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের কয়েকজন থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিসরীয় কর্তৃপক্ষ এখনো নিহত প্রত্যেকের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পড়েই এসব বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় নামেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে যাওয়ার এই পথ তাদের জন্য পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।

এর আগেও ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া থেকে ইউরোপগামী নৌযানে বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছর মার্চেও ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর এসেছিল।

নতুন এই ঘটনায় নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা এবং মানবপাচার চক্রের ভূমিকা জানতে মিসর ও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী তথ্যের অপেক্ষা করছে স্বজনরা।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.