মোবাইলের আলোয় ঢাকা পড়ছে ভালোবাসা: সম্পর্কে মোবাইলের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞান যা বলছে

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:৫৮ (শুক্রবার)
মোবাইলের আলোয় ঢাকা পড়ছে ভালোবাসা: সম্পর্কে মোবাইলের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞান যা বলছে

এক সময় সন্ধ্যা নামলেই দম্পতিরা মুখোমুখি বসে দিনের গল্প শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। এখন তারা পাশাপাশি বসেন ঠিকই, কিন্তু দুজনের চোখ থাকে দুটি আলাদা স্ক্রিনে। নাস্তার টেবিল থেকে শোবার ঘর, দিনের প্রতিটি মুহূর্তে যেন ফোনটাই এখন তৃতীয় সঙ্গী। প্রযুক্তি মানুষকে দূরের মানুষের কাছাকাছি রাখে ঠিকই, কিন্তু পাশের মানুষটির সঙ্গে নিঃশব্দে যে দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে, তা অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না।

‘ফাবিং’, নামটা নতুন হলেও অনুভূতি চেনা

সঙ্গীর সামনে বসে ফোনে ডুবে থাকার এই আচরণের একটি নির্দিষ্ট নাম আছে গবেষণার জগতে। একে বলা হয় ‘ফোন স্নাবিং’ বা সংক্ষেপে ‘ফাবিং’ (Phubbing)। বিষয়টি নিছক অভ্যাসের ব্যাপার নয়। একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এর সঙ্গে সম্পর্কের অতৃপ্তি ও মানসিক দূরত্বের সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি যৌথ গবেষণা, যা জার্নাল অব সোশ্যাল অ্যান্ড পারসোনাল রিলেশনশিপসে প্রকাশিত হয়েছে, দেখিয়েছে যে সঙ্গী যখন ফোনে ব্যস্ত থাকার কারণে উপেক্ষিত বোধ করেন, তখন তিনি নিজেকে কম ভালোবাসা পাওয়া ও কম গুরুত্ব পাওয়া মানুষ মনে করেন, যা সরাসরি সম্পর্কের সন্তুষ্টি কমিয়ে দেয়। গবেষকরা বলছেন, ফোন ব্যবহারের পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য না থাকলেও তা নিঃশব্দে দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

একইরকম ফলাফল উঠে এসেছে আরও কয়েকটি গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পার্টনার ফাবিং ফোন নিয়ে দাম্পত্য কলহ বাড়ায়, যা পরবর্তীতে সম্পর্কের সন্তুষ্টি ও ব্যক্তিগত সুখ, দুটোতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুয়ের্তো রিকোতে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতির মধ্যে ফাবিংয়ের হার বেশি, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপের লক্ষণও তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ ফোনের কারণে তৈরি হওয়া এই দূরত্ব শুধু সম্পর্কেই নয়, প্রভাব ফেলে মানসিক স্বাস্থ্যেও।

যেভাবে চুপিসারে ভাঙে সম্পর্কের সুর

কথা বলার চেয়ে ফোন হয়ে ওঠে বেশি জরুরি সারাদিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে সঙ্গীর দিনটা কেমন কাটল জানতে চাওয়ার বদলে যদি হাতে প্রথমে ফোনটাই উঠে আসে, তাহলে বুঝতে হবে ছোট ছোট কথোপকথনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সম্পর্ক গড়ে ওঠে ঠিক এই ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই।

নীরবতাও হয়ে ওঠে অস্বস্তির

সুন্দর একটা সম্পর্কের অন্যতম আরামদায়ক দিক হলো একসঙ্গে চুপচাপ বসে থাকার সেই স্বস্তি। কিন্তু প্রতিটি বিরতিতে যদি ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার তাড়না চলে আসে, তাহলে সেই নীরবতা আর সুন্দর থাকে না। একই ঘরে থেকেও দুজন যেন দুটো আলাদা জগতে বাস করতে শুরু করেন।

স্ক্রিন টাইম নিয়ে বারবার খুনসুটি

ফোন ব্যবহার নিয়ে যদি প্রায়ই মনোমালিন্য হয়, তাহলে বুঝতে হবে আসল সমস্যাটা স্ক্রিন টাইম নয়। আসল কারণ উপেক্ষিত হওয়া বা সঙ্গীর পুরনো মনোযোগটুকু না পাওয়ার অভিমান। ফোনটা তখন শুধু সেই না বলা অভিযোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

অচেনা মানুষদের নিয়ে বেশি জানাশোনা

প্রিয় মানুষটি দুপুরে কী খেয়েছেন তা হয়তো অজানা, অথচ কোন তারকা কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বা কলেজ বন্ধুর আজকের পোস্ট, সবই মুখস্থ। সঙ্গী ইদানীং কী নিয়ে ভাবছেন, কীসের অপেক্ষায় আছেন, এই খোঁজ যখন কমে আসে, তখন বুঝতে হবে প্রিয়জনের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে অচেনা মানুষেরা।

দূরত্ব ঘোচানোর উপায়ও আছে

গবেষকরা বলছেন, সমাধান কঠিন কিছু নয়। ফোন ব্যবহারের সময় ও পরিস্থিতি নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, খাবার টেবিল বা শোবার আগের সময়টুকু ফোনমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত, কিংবা ফোন ব্যবহারের সময়টুকুতেও সঙ্গীকে সঙ্গে নেওয়া, এই ছোট ছোট পরিবর্তনই ফিরিয়ে আনতে পারে হারানো মনোযোগ ও নৈকট্য।

ভালোবাসা বড় কোনো উপহার বা বিশেষ মুহূর্তে আটকে থাকে না, থাকে রোজকার সেই ছোট ছোট মনোযোগে, একটুখানি চোখে চোখ রাখায়, নিঃশব্দে হাত ধরার মধ্যে। ফোনটা পাশে রেখে সেই মুহূর্তগুলো ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তটা আজই নেওয়া যায়, কারণ সম্পর্ক বাঁচে মনোযোগেই, স্ক্রিনের আলোয় নয়।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.