সাইবার সুরক্ষা আইনে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় প্রতীক অবমাননার সব মামলা বাতিল
সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আইনটি পাস হওয়ার পর সামনে এসেছে এমন তথ্য, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ও জাতির পিতাকে নিয়ে অবমাননাকর প্রচারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাতিলের পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্তদেরও দায়মুক্তি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের অনেকে বলছেন, এটি শুধু বিতর্কিত নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এক ধরনের আত্মসমর্পণ।
গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এ পূর্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের একাধিক ধারা বাতিল করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ও জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রচারণা সংক্রান্ত ধারাও।
নতুন আইনের ৫০ ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ ধারার অধীনে চলমান মামলা, তদন্ত এবং আদালতের দেওয়া দণ্ড ও জরিমানা বাতিল বলে গণ্য হবে।
এর ফলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণা, রাষ্ট্রীয় প্রতীক অবমাননা, ধর্মীয় উসকানি, মানহানি, ডিজিটাল প্রতারণা ও সাইবার সন্ত্রাসের মতো অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোরও কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে অপপ্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই আইনে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কোটি টাকার জরিমানার বিধান ছিল।
এখন সেই ধারাই পুরোপুরি বাতিল হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জে আই খান পান্না প্রশ্ন তুলেছেন, “দেশটা কি এখন রাজাকারদের হাতে চলে গেছে? যারা জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের কথা বলে, তাদের জন্যই কি এই দায়মুক্তি?”
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া লোকদের জন্য আইন শিথিল করা হলে সেটি ভয়াবহ বার্তা দেয়।”
অবসরপ্রাপ্ত এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে খুশি করতেই এই দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে কারা লাভবান হবে, তা দেশের মানুষ বুঝতে পারছে।”
অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, অতীতের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে রাজনৈতিক হয়রানি ও মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই নতুন আইন করে কিছু ধারা বাতিল করা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নামে কেন মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় প্রতীক অবমাননার অভিযোগও সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হলো?
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন আইনের মাধ্যমে সরকার একদিকে ডিজিটাল আইনের কঠোরতা কমানোর দাবি করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে চরম বিতর্ক ও বিভাজনের জন্ম দিতে পারে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.