ঢাকা পোস্টের সম্পাদককে যেভাবে হুমকি দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল ইউনুসের প্রেস সচিব
গতকাল ছিল ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। যখন বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের দেশান্তরী হওয়ার করুণ গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হুমকি, মামলা এবং শেষ পর্যন্ত সপরিবারে দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ঢাকা পোস্ট’-এর সাবেক সম্পাদক মহিউদ্দীন সরকার।
মহিউদ্দীন সরকার তার লেখায় জানান, ঢাকা পোস্টে এনসিবিটির পাঠ্যপুস্তকের নিম্নমানের কাগজ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তিনি সাবেক প্রেস সচিব ও ডেপুটি প্রেস সচিবের হুমকি ধামকি আর খারাপ ব্যাবহার প্রসঙ্গে বলেন,
“আনুমানিক সোয়া দশটার দিকে প্রেস সচিব শফিক ভাইয়ের ফোন আসে। তিনি কোনো একটি সংবাদ নিয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত ছিলেন। মালিকের কাছে অভিযোগ করা, চাকরি খেয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন হুমকি-ধমকির কথা বলেন। আমি তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তিনি স্বাভাবিক হননি। শফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় থাকলেও, এ ধরনের আচরণ মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল। পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারি, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রেস উইং ঢাকা পোস্টের বিরুদ্ধে বেশ নেতিবাচক ছিল। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কভার করার জন্য কার্ডই দেওয়া হয়নি এবং এসবি পাস আটকে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার আমার ব্যাপারে অত্যধিক নেতিবাচক ছিলেন।”
পরবর্তিতে প্রতিবেদনটি ভাইরাল হওয়ার পর একদিকে যেমন তথ্য মন্ত্রণালয়ে তার ডাক পড়ে, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে ও তার সন্তানদের প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া শুরু হয়। এমনকি তার সন্তানদের স্কুল থেকে তুলে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তার অভাবে তিনি সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
পেশাগত কারণে রোষানলে পড়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, এনসিপি নেতার মানহানি মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই বাড্ডা থানায় তার বিরুদ্ধে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে কোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত না থেকেও এমন মামলার মুখোমুখি হওয়া তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। মহিউদ্দীন সরকারের মতে, এই মামলাগুলো ছিল তাকে পেশাগতভাবে দমানোর একটি পরিকল্পিত চেষ্টা। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে কখনোই কারো কোনো ক্ষতি করেছি মনে পড়ে না… পেশার সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোনো কাজ করেছি বলে মনে হয় না।
মিডিয়া হাউজ দখল এবং সম্পাদক পরিবর্তনের অস্থিরতার মধ্যে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গত বছরের ঈদুল আযহার পরদিন সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন তিনি। বিদায় নিতে পারেননি দীর্ঘদিনের সহকর্মী এমনকি তার একান্ত আপনজন চালক স্বাধীনের কাছ থেকেও। দেশ ছাড়ার পরও তার বিরুদ্ধে একই থানায় আরও একটি মামলা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ফেসবুক পোস্টের শেষে এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সহকর্মীদের কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরে আসুক—এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারের সময়ে গণমাধ্যম যেন ভালো থাকে এবং সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, সেই প্রার্থনাও করেছেন তিনি।
মহিউদ্দীন সরকারের এই অভিজ্ঞতা বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে তার এই ‘নির্বাসন’ ও ‘নিপীড়নের’ গল্প সাংবাদিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.