অভাব, অবহেলা আর এক তরুণের লড়াই

প্রকাশিত: ৩০ মার্চ, ২০২৬ ২৩:১৭ (মঙ্গলবার)
অভাব, অবহেলা আর এক তরুণের লড়াই

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর দুর্গম চরাঞ্চল নারায়ণপুর। যেখানে পৌঁছাতে হলে একের পর এক নদী পার হতে হয়, যেখানে রাস্তা মানেই কাদা, আর উন্নয়ন যেন দূরের কোনো গল্প। সেই জনপদ থেকেই উঠে এসেছেন মো. তাইজুল ইসলাম—একজন সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকের সহকারী, যিনি এখন হাজারো মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম।

দারিদ্র্যের ভেতর বেড়ে ওঠা

তাইজুল ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়। সংসারে অভাব এতটাই প্রকট যে, নিজের কোনো বসতভিটাও নেই—অন্যের জমিতে ঘর তুলে বাস করতে হয়।
বাবা-মা দুজনই শ্রবণ প্রতিবন্ধী। পরিবারের দায়িত্ব তাই অনেকটাই তার কাঁধে।

ঢাকায় নির্মাণশ্রমিকের সহকারী হিসেবে কাজ করে সংসার চালান তিনি। কয়েক মাস কাজ করে যখন বাড়িতে ফেরেন, তখনই একটু সময় পান নিজের মতো করে কিছু করার।

ভিডিওই তার আশ্রয়

এই সময়টাতেই হাতে তুলে নেন মোবাইল ফোন। শুরু করেন ভিডিও বানানো।
কেউ হয়তো এটাকে বিনোদন মনে করে, কিন্তু তাইজুলের কাছে এটা অনেক বেশি কিছু।

তার নিজের ভাষায়,
“অভাব আর মানুষের অবহেলাকে ভুলে থাকতে ভিডিও করি। কিন্তু আসলে আমি চাই—আমাদের এলাকার মানুষদের কষ্ট সবাই দেখুক।”

ভাইরাল হওয়ার গল্প

স্বাধীনতা দিবসে করা একটি সাধারণ ভিডিও—একটি দোকানে গিয়ে জিলাপির দাম জিজ্ঞেস করা—হঠাৎ করেই ভাইরাল হয়ে যায়।
সরল ভাষা, সহজ উপস্থাপন—এই দুইয়ে ভিডিওটি পৌঁছে যায় লাখো মানুষের কাছে।

কিন্তু ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া—
কেউ তাকে ভালোবাসা দেয়, কেউ হাসাহাসি করে।

তাইজুল এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না।
তিনি বলেন,
“মানুষ ট্রল করলে আমার কষ্ট নাই। আমি চাই, আপনারা আমাদের এলাকার খবরটা দেখেন।”

অবহেলিত জনপদের কণ্ঠস্বর

তাইজুলের ভিডিওগুলোতে শুধু হাস্যরস নয়, লুকিয়ে থাকে বাস্তবতার কঠিন চিত্র।
কখনো কাদা পানিতে দাঁড়িয়ে গ্রামের রাস্তার অবস্থা দেখান,
কখনো নদী পারাপারের কষ্ট তুলে ধরেন,
কখনো আবার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা বলেন।

তার এক ভিডিওতে দেখা যায়—মানুষ গরু নিয়ে নদী পার হচ্ছে, শুধু একটি সেতু না থাকার কারণে।
এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই বড় এক বাস্তবতার গল্প বলে।

‘আমি সাংবাদিক না’

নিজেকে কখনো সাংবাদিক দাবি করেন না তাইজুল। বরং তার অভিযোগ—
“আপনারা সাংবাদিকরা এখানে আসেন না। আমাদের এলাকার খবর কেউ করে না। তাই আপনাদের আনার জন্য আমি ভিডিও করি।”

এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের অভিমান, আবার এক ধরনের প্রত্যাশাও।

স্বপ্নটা খুব বড় নয়

তাইজুলের স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়।
তিনি শুধু চান—তার এলাকার মানুষ একটু ভালো থাকুক,
রাস্তা হোক, যোগাযোগ সহজ হোক,
মানুষের কষ্ট কমুক।

তিনি বলেন,
“আমি বোকাসোকা মানুষ। ভুল হতেই পারে। কিন্তু আমি চাই, চরের মানুষগুলোর উন্নয়ন হোক।”

এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ চেষ্টা

চেহারায়, পোশাকে বা কথায় হয়তো শহুরে স্মার্টনেস নেই।
কিন্তু তার কথাগুলো দরকারি, তার চেষ্টা বাস্তব।

অনেক সময় বড় বড় প্ল্যাটফর্ম যেখানে পৌঁছাতে পারে না,
সেখানে একজন সাধারণ মানুষ নিজের মতো করে মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

এই কারণেই হয়তো—
ভাইরাল হওয়ার বাইরে গিয়ে, তাইজুল ইসলাম এখন অনেকের কাছে এক মানবিক গল্পের নাম।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.