একাত্তর ও চব্বিশকে এক কাতারে আনার রাজনীতি
চব্বিশের গণআন্দোলনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে সমান করে ফেললে তা ‘বড় বিপর্যয়ের কারণ হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গত ২৮ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা একবারই এসেছে। এর আগেও আসেনি, এর পরেও আসবে না। এই স্বাধীনতার পর আমাদের যে রাজনৈতিক অর্জনগুলো, সেখানে অনেক অর্জন আমাদের আছে।”
এর আগে শুক্রবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস অন্য কোনো ইতিহাসের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ নেই। অনেকে সংবিধানের প্রস্তাবনায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরকে সমান করতে চেয়েছিলেন। আমরা মনে করি, একাত্তরের ইতিহাস অনন্য ও অবিসংবাদিত।”
প্রশ্ন হলো, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে কারা বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এক কাতারে ফেলতে চায় বা কারা চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মতো মহিমান্বিত করতে চায়? তাদের উদ্দেশ্য কী এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিদেরও কেন এখন এই প্রবণতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হচ্ছে?
মূলত এই প্রবণতাটি শুরু হয়েছিল চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যেমন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেরকম ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ‘জুলাইযোদ্ধা’ নামে তাদের গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
একটি রাজনৈতিক আন্দোলন বা সরকার পতনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ নাম দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গেজেটভুক্ত করে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। শুধু তাই নয়, চব্বিশের ৫ অগাস্টের পরে এই অভ্যুত্থানকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা, এমনকি কেউ কেউ এই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও মহান করে তোলার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরাজিত পাকিস্তানি সেনাদের এ দেশীয় দোসররা। চব্বিশের অভ্যুত্থানের বিজয়কে তারা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলেও অভিহিত করার চেষ্টা করেছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে তারা ১৯৭১ সালের গ্লানি মুছে দেওয়া এবং ১৯৭১-এর প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে তাদের ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা করেছে বা এখনও করছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা বা মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও মহিমান্বিত করার এই রাজনীতিটা বোঝা খুব কঠিন নয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জাতীয় ও রাজনৈতিক জীবনে একটি বড় ঘটনা। অতীতের যেকোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেয়ে এটির ব্যাপ্তি অনেক বড় ছিল। যারা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যারা প্রাণ দিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াইয়ে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করা; মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত করা; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলা; মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ও মীমাংসিত সত্যের বিপরীতে গিয়ে নতুন বয়ান তৈরির মধ্য দিয়ে এটিকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলার পুরোনো রাজনীতি প্রতিষ্ঠার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, সেটি বিপজ্জনক এবং এই ধরনের তৎপরতা মূলত চব্বিশের অভ্যুত্থানের লক্ষ্য উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম তথা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ আর একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে নির্দিষ্ট একটি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা অভ্যুত্থানকে এক করে ফেলার যে রাজনীতি—তার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর অতীতের গ্লানি। পরাজয়ের ইতিহাস। প্রতিশোধের মানসিকতা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্র যে কিছু বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল, যেমন মাসিক ভাতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে তাদের সন্তানদের অগ্রাধিকার—সেভাবেই জুলাইযোদ্ধাদেরও মাসিক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। শুধু তাই হয়, সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতেও জুলাইযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগও রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধারাও মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। তাদের সঙ্গে মিল রেখে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোকেও একই অঙ্কের ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধাদের করমুক্ত আয়ের সীমাও অভিন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ নানাভাবেই জুলাইযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের জন্য সরকার চাইলে অন্য কোনো উপায় বের করতে পারত। কিন্তু তাদের উদ্যোগগুলো দেখে স্বভাবতই এটা মনে হতে পারে যে, তারা জুলাইযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো সম্মানিত করতে চেয়েছে এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে—যার পেছনে রয়েছে একটি বিরাট রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি।
প্রশ্ন হলো, একটি গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদেরকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেটভুক্ত করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তাদেরকে মাসিক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার আওতায় আনার যে ঘটনা ঘটল, ভবিষ্যতে আবারও যদি এরকম একটি অভ্যুত্থানে কোনো সরকারের পতন ঘটে, তখনও কি ওই আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মাসিক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার আওতায় আনা হবে? এটা কি বাস্তবসম্মত?
১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠারও একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পরে। যদিও ১৯৭৫ সালের পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের এমন সব বয়ান জনপরিসরে ছাড়া হয়েছে; মুক্তিযুদ্ধের কিছু বিষয় নিয়ে এমন সব বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে, যা এই যুদ্ধে আত্মদানকারী লাখ লাখ মানুষ এবং এই যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তরে বিষাক্ত তীরের মতো বেঁধে। এইসব বয়ান এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি তাদের ভূমিকা বা তাদের অপরাধ আড়াল করতে চায়, সেটি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরই বোঝার কথা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছিল। তাদের দাবি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ নয়, বরং দুই হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন! প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কেন দুই হাজার বলার চেষ্টা করা হলো? তার কারণ, শুরু থেকেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া বা তারও চেয়ে মহিমান্বিত করার চেষ্টা চলেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা দেড় হাজার। বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বলা হয় ৩০ লাখ। সুতরাং চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা দুই হাজার বলার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অনেকেই মনে করেন।
তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করা গেলে ১৯৭১ সালে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া সহজ হয়। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১ ও বঙ্গবন্ধুর নাম শুনলেই যাদের গায়ে জ্বালা ধরে, তারা মূলত এই শব্দগুলোকে ভয় পায়। তারা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। একাত্তরে পরাজয়ের গ্লানি তারা ভুলতে পারে না। ফলে তারা এমন একটি বয়ান তৈরি করতে চায় যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বা ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেওয়া যায় এবং সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে মহিমান্বিত করতে তাকে একাত্তরের কাতারে নিয়ে যাওয়া যায়।
আশার সংবাদ হলো, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান অংশীদার বিএনপি অন্তত এই রাজনীতির অংশ হচ্ছে না। বরং তারা একাত্তরকে যেকোনো কিছুর ওপরে স্থান দিচ্ছে এবং তারা একাত্তর ও চব্বিশকে এক কাতারে ফেলার রাজনীতির বিষয়ে যে সচেতন আছে, সেটি অন্তত স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে পরিষ্কার বলেই মনে হয়।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.