২৫ মার্চের কালরাত: গণহত্যার বিভীষিকা আর স্বাধীনতার সূর্যোদয়

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:৩৮ (মঙ্গলবার)
২৫ মার্চের কালরাত: গণহত্যার বিভীষিকা আর স্বাধীনতার সূর্যোদয়

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত বাঙালির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বিভীষিকার নাম। সেদিন রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে শুরু করে ইতিহাসের নৃশংসতম সামরিক অভিযানগুলোর একটি, যার নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এই অভিযান ছিল কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি ছিল গণহত্যা, জাতিগত নিধন, সাংস্কৃতিক ধ্বংস এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ঢাকাসহ সারা দেশে ট্যাঙ্ক, মর্টার, ভারী মেশিনগান আর আগুন নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকা, নীলক্ষেত, ধানমন্ডি, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, সংবাদপত্র অফিস, ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের বাসভবন, এমনকি উপাসনালয়ও তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য, শ্রমজীবী মানুষ, সাধারণ নাগরিক, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কেউই ছিল না তাদের বর্বরতার বাইরে।

সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ তারা জানত, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং প্রতিরোধের কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও রক্ষা পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. ফজলুর রহমান, অধ্যাপক মুনীরউজ্জামান, শরাফত আলী, মুহম্মদ আবদুল মুকতাদিরসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর নিশানায় পড়েন। বুদ্ধিজীবী হত্যার সূচনা আসলে এই রাতেই। পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য পরিষ্কার ছিল: বাঙালির নেতৃত্ব, মনন, শিক্ষা ও বোধকে ভেঙে দিয়ে পুরো জাতিকে অচল করে দেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, যা বর্তমানে জহুরুল হক হল নামে পরিচিত, ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম বিশেষ টার্গেট। তারা ধারণা করেছিল, এই হলেই ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। তাই ইকবাল হলে হামলা ছিল তাদের সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেখানে তারা একেবারে বিনা বাধায় ঢুকতে পারেনি। ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিরোধের মানসিকতা এবং কিছু প্রস্তুতি থাকায় পাকিস্তানি সেনারা প্রথম ধাক্কায় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তবে ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক শক্তির কাছে সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। শেষ পর্যন্ত ইকবাল হলও পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে যায় এবং সেখানে চালানো হয় দমন অভিযান। এই প্রতিরোধের ঘটনা প্রমাণ করে, ২৫ মার্চের রাতে বাঙালি একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল না; বরং তারা উপলব্ধি করেছিল, এটি আর রাজনৈতিক অচলাবস্থা নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই।

পাকিস্তানি বাহিনীর সেই রাতের অভিযানের লক্ষ্য ছিল তিনটি। প্রথমত, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, বাঙালি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে অকার্যকর করা। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের মনে এত ভয় সৃষ্টি করা যাতে স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে নিভে যায়। এ কারণেই একই রাতে তারা হামলা চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, পিলখানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছাত্রাবাসে, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়, সংবাদপত্র কার্যালয়ে এবং বুদ্ধিজীবীদের বাসায়। শহর জুড়ে আগুন, গোলাগুলি, বিস্ফোরণ, আর্তনাদ আর মৃত্যুর মিছিল ছিল সেই রাতের চিত্র। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লিখেছিলেন, ঢাকায় সেই রাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, তারপর সারা পূর্ববাংলায় সৈন্যরা ঘরবাড়ি জ্বালায়, দোকানপাট লুট করে, রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ কাক-শেয়ালের খাদ্যে পরিণত হয়। পুরো বাংলাদেশ পরিণত হয় এক শকুনতাড়িত শ্মশানভূমিতে।

এই গণহত্যা ছিল আকস্মিক নয়, ছিল পরিকল্পিত। অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা তৈরি করেন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা। এর উদ্দেশ্য ছিল ২৬ মার্চের মধ্যে বড় শহরগুলো দখল, রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করা, এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে রক্তে ডুবিয়ে দেওয়া। কোনো লিখিত নির্দেশনামা না রেখে মুখে মুখে নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে দায় অস্বীকার করা যায়। কিন্তু ইতিহাসে তাদের অপরাধ চাপা থাকেনি। পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের রিপোর্ট এবং বিভিন্ন গবেষণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত নির্মূল অভিযান।

কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করেছিল, তা হলো তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঠিকমতো বুঝতে পারেনি, আর বোঝেনি বাঙালির সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সাফল্য ছিল না, তা ছিল বাঙালির বহু দিনের বঞ্চনা, অধিকারবঞ্চনা এবং শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণরায়ের বিস্ফোরণ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই এই জাতি ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান হয়ে নির্বাচনী বিজয় পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তিনি সর্বশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা রেখেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যুদ্ধ মানেই রক্ত, শোক, ধ্বংস। কিন্তু পাকিস্তানি রাষ্ট্র গণতন্ত্রের ভাষা বোঝেনি। তারা ভোটের জবাব দিয়েছে গোলায়, আলোচনার জবাব দিয়েছে গণহত্যায়।

২৫ মার্চের রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গ্রেপ্তারের আগেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এটাই ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। পাকিস্তান ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধুকে ধরে ফেললেই সব শেষ। বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে, তার ৭ মার্চের ভাষণের অনুপ্রেরণায়, তার রাজনৈতিক দিশানির্দেশনায় বাঙালি জাতি বুঝে যায় যে আর কোনো আপসের পথ নেই। সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ নেই। ২৫ মার্চের গণহত্যা তাই স্বাধীনতার দাবিকে শুধু জোরালোই করেনি, তা অনিবার্য করে তুলেছিল।

আওয়ামী লীগের অবদান এই জায়গাতেই সবচেয়ে ঐতিহাসিক। কারণ স্বাধীনতার যুদ্ধের পেছনে যে রাজনৈতিক ভিত্তি, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, জনগণের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিকভাবে নৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তার পুরোটাই গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে থেকেই অধিকার আদায়ের চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক প্রয়াস। যখন সেই পথ বন্ধ করা হলো, তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সংগ্রাম রূপ নিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। তাই ২৫ মার্চকে স্মরণ মানে শুধু শোক নয়, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল্যও স্মরণ করা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে আলাদা করে বড় করে না দেখলে ২৫ মার্চের ইতিহাসই অপূর্ণ থেকে যায়। কারণ ২৫ মার্চের গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু ছিল কেবল বাঙালি জনগণ নয়, ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাঙালির জাতীয় ঐক্য। তাকে বন্দি করে তারা সেই ঐক্য ভাঙতে চেয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন আর শুধু ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতির চেতনা। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা। তার ডাকে, তার চিন্তায়, তার স্বপ্নে, তার ত্যাগে বাঙালি বুঝেছিল তারা একটি আলাদা জাতি, তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগের চেয়েও তিনি বড় করে দেখেছিলেন বাংলার মানুষের অধিকারকে। এ কারণেই তিনি আজও কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি জাতির পিতা।

২৫ মার্চের কালরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ে আসেনি; এটি এসেছে গণহত্যা সহ্য করে, রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, এবং এক মহান নেতৃত্বের পথনির্দেশনায়। সেই রাতের বিভীষিকার ভেতরেও ইকবাল হলের ছাত্রদের প্রতিরোধ, রাজারবাগের পুলিশের লড়াই, পিলখানার প্রতিরোধ, সাধারণ মানুষের সাহস দেখিয়ে দিয়েছে যে বাঙালিকে গণহত্যা দিয়ে চিরকাল শাসন করা যায় না। আর এই প্রতিরোধকে স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব।

আজ ২৫ মার্চকে স্মরণ মানে কেবল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার নিন্দা নয়, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের মহিমা, আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরায় স্মরণ করা। কারণ ২৫ মার্চের অন্ধকার যত ভয়াবহই হোক, সেই অন্ধকার ভেদ করেই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভোর। আর সেই ভোরের স্থপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.