জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৬ ০৩:৫৭ (মঙ্গলবার)
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

আজ ১৭ মার্চ—স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া এক সাধারণ শিশু পরিণত হয়েছিলেন একটি জাতির মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা এক মহান নেতায়। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস কল্পনাই করা যায় না। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে তিনি বাঙালিকে সংগঠিত করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি, যেখানে তাঁর নেতৃত্বই ছিল বাঙালির ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় রচিত হয়। হত্যাকারীরা ভেবেছিল একজন মানুষকে সরিয়ে দিলে তাঁর আদর্শও মুছে যাবে, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা গেলেও তাঁর চিন্তা, দর্শন ও স্বপ্নকে হত্যা করা যায়নি।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব শুধু বাংলাদেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিশ্বপরিসরেও তিনি ছিলেন সমাদৃত এক রাষ্ট্রনায়ক। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে দেখে বলেছিলেন, তিনি হিমালয় দেখেননি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছেন—এই মন্তব্য তাঁর ব্যক্তিত্বের উচ্চতা বোঝাতে যথেষ্ট। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁকে জনগণের নেতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ত্যাগই বঙ্গবন্ধু উপাধিকে অর্থবহ করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেছেন, আর সোনিয়া গান্ধী তাঁকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুকে উপমহাদেশের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা বলে আখ্যা দেন। এমনকি পাকিস্তানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও পরে স্বীকার করেছেন, যাকে তারা একসময় দেশদ্রোহী বলেছিল, তিনি আসলে নিজের জাতির কাছে ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।

তবে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি থামেনি। তাঁর অবদান খাটো করার চেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা একটি জাতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বহু দেশে প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বিতর্ক যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা সেই বিভাজনেরই চরম বহিঃপ্রকাশ। এটি কোনো দলীয় স্থাপনা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অমূল্য স্মারক। সেই বাড়ি থেকেই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে, সেই বাড়িতেই সংঘটিত হয়েছে ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এমন একটি স্থাপনা ধ্বংস করা মানে নিজের ইতিহাসকে আঘাত করা। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু জাতীয় স্মৃতি ধ্বংস কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।

বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করা মানে শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; তাঁর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব গ্রহণও বটে। তিনি যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও ন্যায়বিচারের সংকট আজও দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস—তিনি মনে করতেন দেশের প্রকৃত মালিক জনগণই।

আজকের তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে চোখে দেখেনি, কিন্তু তাঁর গড়া রাষ্ট্রেই বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিতে হবে তথ্যভিত্তিক ইতিহাসের মাধ্যমে, রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে নয়। কারণ সত্য ইতিহাস নিজেই শক্তিশালী। বঙ্গবন্ধু কোনো এক দলের সম্পত্তি নন; তিনি সমগ্র জাতির নেতা, স্বাধীনতার প্রতীক এবং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ভিত্তি।

১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার অর্থ হলো ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, স্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্যকে তুলে ধরা। যে জাতি তার প্রতিষ্ঠাতাকে ভুলে যায়, সে জাতি নিজের পথ হারায়; আর যে জাতি ইতিহাসকে ধারণ করে, ইতিহাসও তাকে পথ দেখায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস এবং স্বপ্ন এখনো বাঙালির পথচলার আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.