বৈরী সমীকরণ ভেঙে সংসদে তৃণমূলের এমরান চৌধুরী

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২৩:০৯ (সোমবার)
বৈরী সমীকরণ ভেঙে সংসদে তৃণমূলের এমরান চৌধুরী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীর বিজয় শুধু একটি আসন জয়ের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রভাববলয়, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অপপ্রচার এবং জোট রাজনীতির জটিল অঙ্ক পেরোনোর গল্প। তিনি ১ লাখ ৯ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৫৬৯ ভোট। ব্যবধান খুব বড় না হলেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জয় তাৎপর্যপূর্ণ।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি জামায়াতের ঢাকা উত্তর মহানগরের আমীর এবং কেন্দ্রীয় নেতা । সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, দলীয় কাঠামোর সমর্থন এবং কেন্দ্রীয় পরিচিতি তাকে এই আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে নির্বাচনী লড়াইটি শুরু থেকেই সমানতালে এবং কৌশলগত ছিল।

গোলাপগঞ্জের সন্তান এমরান আহমদ চৌধুরী ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতা। সিলেট জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে তার রাজনৈতিক উত্থান শুরু, পরে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হন এবং এখনও সেই দায়িত্বে আছেন। পেশায় আইনজীবী হিসেবে আদালত ও রাজনীতির মাঠ দুই জায়গাতেই তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার কারণে স্থানীয়ভাবে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়েছে।

তবে তার পথ সহজ ছিল না। মনোনয়ন পর্যায়ে আরেক বিএনপি নেতা এবং ২০১৮ সালের ভোটে ধানের শীষে নির্বাচন করা ফয়সাল আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। যাচাই বাছাই শেষে এমরান বৈধ প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হন, কিন্তু এতে স্থানীয় রাজনীতিতে বিভাজন তৈরি হয়। উপজেলা পর্যায়ের বিএনপির একটি বলয়, এমনকি ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু শীর্ষ নেতৃত্ব প্রত্যাশিতভাবে সক্রিয় ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তাকে আংশিক সংগঠনগত সমর্থন নিয়েই মাঠে নামতে হয়েছে।

এর পাশাপাশি নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে সেটিকে তার সঙ্গে যুক্ত করে অপপ্রচার চালানো হয়। সমর্থকরা একে পরিকল্পিত চরিত্রহননের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে জোট রাজনীতির বাস্তবতাও তাকে চাপে ফেলে। বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তের প্রার্থী হাফিজ ফখরুল স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ায় ভোটের একটি অংশ বিভক্ত হয়। সব মিলিয়ে এটি ছিল বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার নির্বাচন।

সিলেট ৬ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ একাধিকবার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে । এর আগে সৈয়দ মকবুল হোসেনও এ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং নিজস্ব প্রভাববলয় গড়ে তুলেছিলেন। ফলে এই আসনে রাজনৈতিক লড়াই সব সময়ই গুরুত্ব বহন করে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটে এমরানের জয় কেবল দলীয় সাফল্য নয়, গোলাপগঞ্জভিত্তিক এক তৃণমূল নেতার উত্থান হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকে বিয়ানীবাজারকেন্দ্রিক প্রভাবের কারণে গোলাপগঞ্জের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূণ্যতা নিয়ে আলোচনা ছিল। সেই বাস্তবতায় তার বিজয় স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিজয়ের পর করণীয় কী। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই আসনে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোতে যে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে কী ধরনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন তিনি, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা। দলীয় বিভাজন কাটিয়ে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করা, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের উন্নয়নে ভারসাম্য রক্ষা, এবং তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জন এই তিনটি চ্যালেঞ্জ তার সামনে স্পষ্ট।

এমরান আহমদ চৌধুরীর রাজনৈতিক শক্তি তার তৃণমূল সংযোগ এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। দুর্বলতা হতে পারে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও উচ্চ প্রত্যাশার চাপ। বৈরী পরিবেশে জয় পাওয়া এক বিষয়, কিন্তু সেই জয়কে টেকসই রাজনৈতিক নেতৃত্বে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সিলেট-৬ এখন তাকিয়ে আছে, এই তৃণমূল থেকে উঠে আসা আইনজীবী রাজনীতিক সংসদে গিয়ে কতটা কার্যকর প্রতিনিধি হতে পারেন এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের এই জয় কতটা বাস্তব উন্নয়নে রূপ নেয়।

বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.