নির্বাচনের পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়তে পারে

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৩:১৩ (বুধবার)
নির্বাচনের পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়তে পারে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের প্রভাব আরও দৃশ্যমানভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বেইজিং ঢাকায় তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক মাঠে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও, ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আওয়ামী লীগের সময়কার মতো ঘনিষ্ঠ নয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই সুযোগে চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় ভারত সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতসহ একাধিক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলেছে।

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রয়টার্সকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে ভারত শেখ হাসিনার সময়কার দমন-পীড়নের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। তার ভাষায়, জনগণ এমন কোনো সম্পর্ক মেনে নেবে না যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করে। একই সুরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়, তবে তা হবে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই।

রয়টার্স আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতির প্রভাব ক্রীড়াক্ষেত্রেও পড়েছে। আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে না নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফর ও ভিসা ইস্যুতেও কড়াকড়ি বাড়ে। শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও কমে গেছে, যদিও গত ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছিলেন।

অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে অবস্থান আরও শক্ত করছে। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার সিংহভাগই চীন থেকে আমদানি। হাসিনার পতনের পর কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নতুন চীনা বিনিয়োগের খবর মিললেও, ভারতীয় বড় কোম্পানিগুলোর নতুন বিনিয়োগ তেমন দেখা যায়নি।

নিউ দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টানটিনো জাভিয়ার রয়টার্সকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে চীন প্রকাশ্য ও নেপথ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তাও তারা কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিনের মতে, ঢাকা ও দিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারে, তবে পরবর্তী সরকার স্বাভাবিকভাবেই চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে। তবু আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতেই হবে।

সব মিলিয়ে রয়টার্সের মূল্যায়ন হলো, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল হলেও, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাবে। এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের বড় পররাষ্ট্রনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

বায়ান্ননিউজ২৪/নিউজরুম এডিটর

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.