১৯৭১-এর ভূমিকা অস্বীকার, নারী নেতৃত্ব নাকচ ও শরিয়াহ ইঙ্গিত: আল জাজিরাকে জামায়াত আমির

প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬ ১২:৪৪ (মঙ্গলবার)
১৯৭১-এর ভূমিকা অস্বীকার, নারী নেতৃত্ব নাকচ ও শরিয়াহ ইঙ্গিত: আল জাজিরাকে জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা অস্বীকার করেছেন এবং দলের প্রধান পদে নারীর নেতৃত্বকে ‘অসম্ভব’ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইসলামী আইন প্রবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে বিষয়টি সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেন।

আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের সঙ্গে দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে জামায়াতের রাজনীতি, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, গণমাধ্যম স্বাধীনতা, যুদ্ধাপরাধ ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কসহ নানা ইস্যুতে দলের অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াত আমির।

নারী নেতৃত্ব ‘অসম্ভব’ দাবি

সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, জামায়াতের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ‘আল্লাহপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের’ কারণে সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, মাতৃত্ব ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে নারীরা এমন নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতায় পড়বেন।

এই বক্তব্যের বিপরীতে আল জাজিরার সাংবাদিক স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশেই গত তিন দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কাউকে অসম্মান করে না, কিন্তু তাদের সংগঠনের নেতৃত্ব কাঠামোতে নারীদের সর্বোচ্চ পদে দেখার সুযোগ নেই।

সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী নেই

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কেন কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি— এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দল এখনো প্রস্তুতির পর্যায়ে আছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

ইসলামী আইন প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থক অবস্থান

ইসলামী আইন (শরিয়াহ) চালু করা হবে কি না— এমন প্রশ্নে জামায়াত আমির সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে দেশের উন্নতির প্রয়োজনে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন না বলেও দাবি করেন।

গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ

সাক্ষাৎকারে আল জাজিরা জামায়াত-সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের কিছু নেতার গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের বিষয়টি তোলে। বিশেষ করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ আসে।

ডা. শফিকুর রহমান এসব বক্তব্যকে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয় বলে দাবি করেন এবং বলেন, বিষয়টি ইসলামী ছাত্রশিবিরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ১৯৭১ নিয়ে সম্পূর্ণ অস্বীকার

২০০১–২০০৬ মেয়াদে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জামায়াত আমির তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, এসব হামলায় জামায়াত জড়িত ছিল না।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়েও তিনি অবস্থান নেন অস্বীকারের। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল ‘রাজনৈতিক’, স্বাধীনতার বিরোধিতা নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে তিনি ‘বিকৃত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, জামায়াত কোনো নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে যে অভিযোগ এসেছে, তা প্রমাণিত নয়।

সমালোচনার ঝড়

ডা. শফিকুর রহমানের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ভূমিকা অস্বীকার, নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা এবং গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি বিষয়ে দলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য জামায়াতের অতীত অবস্থানকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে এবং নির্বাচনের প্রাক্কালে দলটির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা সাক্ষাৎকার।

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.