নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে বিদেশিদের হাতে চট্টগ্রামের নিউমুরিং!
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে দেশজুড়ে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও কৌশলগত এই টার্মিনালটি দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবস্থাপনা ও নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। অথচ ভোটের আগে তড়িঘড়ি করে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াকে অনেকেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
নিউমুরিং টার্মিনাল চালুর পর থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ের প্রধান ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশীয় শ্রমিক ও অপারেটরদের দক্ষতায় এর সক্ষমতা প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়েও বেড়েছে। জাহাজের অবস্থানকাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে তৈরি হয়েছে একের পর এক রেকর্ড এবং আমদানি রপ্তানি ব্যয়ও নেমেছে সহনীয় পর্যায়ে। এসব কারণে টার্মিনালটি বর্তমানে বন্দরের আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার অন্যতম ভিত্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সরাসরি বিদেশে চলে যাবে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লাভের বড় অংশ দিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্র কার্যত নিজস্ব আয়ের উৎস হারাবে।
বর্তমানে নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালিত হচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। এই ব্যবস্থাপনায় বন্দরের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা দুইই বজায় আছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, টার্মিনালের পাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবন্দর সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা থাকায় বিদেশি অপারেটরের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বন্দর ব্যবহারকারী, শ্রমিক সংগঠন ও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনী ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে গোপনে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশীয় সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে বন্দর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় যে নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, বর্তমান উদ্যোগ তার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বলেও তারা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ বিদেশি অপারেটর নয়; বরং লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, কাস্টমস সংস্কার ও পশ্চাৎ সংযোগ শক্তিশালী করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিলে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই বন্দর আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি ঝুলে আছে। আদালতে শুনানি চলমান থাকা সত্ত্বেও চুক্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা আইনের শাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলছে। আইনজীবীদের মতে, বিচারাধীন বিষয়ে কোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ আইনসম্মত নয়।
সব মিলিয়ে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জাতীয় রাজস্ব, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব সময়ে এমন সিদ্ধান্ত দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলছে, তা নিয়েই বাড়ছে জনমত ও প্রতিরোধের আওয়াজ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.