প্রাক ইসলামিক যুগে যেমন ছিল আজকের আরব ভূখণ্ড...
আজকের আরব বিশ্ব মানেই আধুনিক শহর বিপুল সম্পদ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব। কিন্তু মাত্র দেড় হাজার বছর আগে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চল ছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। তখন আরব ভূখণ্ডে কোনো রাষ্ট্র ছিল না। ছিল না কেন্দ্রীয় আইন বা শাসনব্যবস্থা। সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক। জীবন ছিল কঠিন। অথচ এই সময়টাই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের ঠিক আগের মুহূর্ত।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বসবাস
তৎকালীন আরব ভূখণ্ড বলতে আজকের সৌদি আরব, ইয়েমেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও দক্ষিণ ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা বোঝানো হতো। অধিকাংশ জায়গা ছিল মরুভূমি। পানি ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মানুষ দুইভাবে বসবাস করত। একদিকে ছিল যাযাবর বেদুইন যারা উট ছাগল ও ভেড়া নিয়ে মরু অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। অন্যদিকে ছিল শহরকেন্দ্রিক মানুষ যারা মক্কা, ইয়াসরিব, তায়েফ ও ইয়েমেনের কিছু অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করত।
জনসংখ্যা ও জীবনমান
৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পুরো আরব উপদ্বীপে জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫০ থেকে ৭০ লাখ। মক্কার জনসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। মানুষের জীবনমান ছিল খুব সাধারণ। শিক্ষা ছিল মৌখিক। চিকিৎসা ছিল ভেষজ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক। দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট ছিল নিয়মিত বাস্তবতা।
অর্থনীতি ও জীবিকা
আরব সমাজের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল বাণিজ্য। তেল তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ইয়েমেন থেকে সুগন্ধি লোবান, মির, খেজুর ও মসলা উটের কাফেলায় করে উত্তর দিকে সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নেওয়া হতো। মক্কা ছিল এই বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইয়েমেনে কৃষি তুলনামূলক উন্নত ছিল। মারিব বাঁধের কারণে সেখানে শস্য উৎপাদন হতো। হিজাজ অঞ্চলে খেজুর ছিল প্রধান ফসল।
বিশ্বরাজনীতিতে আরবদের অবস্থান
তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতো দুই পরাশক্তি দ্বারা। একদিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অন্যদিকে সাসানীয় পারস্য। আরব ভূখণ্ড ছিল এই দুই শক্তির মাঝখানে একটি বাফার অঞ্চল। আরবদের নিজস্ব কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় ছিল না। তারা পরিচিত ছিল বাণিজ্যপথ রক্ষাকারী ভাড়াটে সৈন্য ও সীমান্ত পাহারাদার হিসেবে। বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা ছিল প্রান্তিক।
পোশাক আশাক ও দৈনন্দিন জীবন
আরবদের পোশাক ছিল পরিবেশ উপযোগী ও সহজ। পুরুষরা কোমরে ইজার জাতীয় কাপড় পরত এবং উপরে চাদর ব্যবহার করত। মাথায় কাপড় পেঁচানো থাকত রোদ ও বালু থেকে বাঁচার জন্য। নারীরা পরত ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক। অলংকার হিসেবে সোনা রূপা ও রঙিন পাথরের ব্যবহার ছিল প্রচলিত। পোশাক সামাজিক মর্যাদা ও গোত্রীয় পরিচয় প্রকাশ করত।
খাদ্যাভ্যাস
খেজুর ছিল আরব সমাজের প্রধান খাদ্য। উট ও ছাগলের দুধ ছিল নিয়মিত পানীয়। মাংস দৈনন্দিন খাবার ছিল না। উৎসব বা অতিথি আপ্যায়নের সময় মাংস খাওয়া হতো। গম ও যব থেকে রুটি তৈরি করা হতো বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। খেজুর বা আঙুর থেকে তৈরি মদ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল।
ধর্ম ও উপাসনা
৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরব সমাজ ছিল ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত। বহুদেববাদ ছিল প্রধান ধারা। কাবাঘরে প্রায় ৩৬০টি মূর্তি ছিল। হুবাল, লাত, উজ্জা ও মানাত ছিল প্রধান দেবতা। ইয়াসরিব, খায়বার ও ইয়েমেনে ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। নাজরান ও উত্তর আরবে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী ছিল। কিছু মানুষ ছিল হানিফ যারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করত কিন্তু কোনো সংগঠিত ধর্মের অনুসারী ছিল না।
ভাষা ও সংস্কৃতি
তখন কোনো একক আরবি ভাষা ছিল না। বিভিন্ন উপভাষা প্রচলিত ছিল। উত্তর আরবি উপভাষা পরবর্তীতে কুরআনের ভাষার ভিত্তি হয়। দক্ষিণ ইয়েমেনে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ভাষা পরিবার। লিখিত ভাষার ব্যবহার ছিল খুব সীমিত। কবিতা ছিল সংস্কৃতির মূল ধারক। উকাজের মতো বাজার ছিল সাহিত্য ও ভাষা বিনিময়ের কেন্দ্র।
ভারতের সাথে যোগাযোগ
আরবদের সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সমুদ্রপথে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে তারা কেরালা গুজরাট ও সিন্ধু অঞ্চলে যেত। ভারত থেকে আসত মসলা রেশম ও মূল্যবান পাথর। আরব থেকে যেত ঘোড়া খেজুর ও মুক্তা। গ্রিক ও রোমান ইতিহাসেও এই বাণিজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান যন্ত্রপাতি ও জ্ঞান
আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান তখন ছিল না। তবে ব্যবহারিক জ্ঞান ছিল উন্নত। তারা তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করত। ভেষজ চিকিৎসা জানত। মরুভূমিতে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছিল। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ছিল সাধারণ যেমন ছুরি সূঁচ চামড়া কাটার সরঞ্জাম ও কূপ থেকে পানি তোলার ব্যবস্থা।
যৌনতা ও সামাজিক অবক্ষয়
প্রাক ইসলামি আরব সমাজে যৌন নৈতিকতা ছিল অস্পষ্ট ও গোত্রভেদে ভিন্ন। একাধিক ধরনের সম্পর্ক প্রচলিত ছিল। দাসী নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। নারীর সম্মান ছিল গোত্রীয় বিষয়। কন্যাশিশুকে অনেক সময় বোঝা মনে করা হতো। এই সামাজিক বাস্তবতাকে অনেক ঐতিহাসিক নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শেষকথা হলো ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের আরব সমাজ ছিল রাষ্ট্রহীন বিভক্ত ও প্রান্তিক। কিন্তু ঠিক এই সময়েই ইতিহাস এক নতুন মোড় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যে মরুভূমি একদিন বিশ্বের প্রান্তে ছিল অল্প সময়ের মধ্যেই তা হয়ে ওঠে বিশ্ব ইতিহাসের কেন্দ্র। তাই ৫৭০ সাল শুধু একটি বছর নয় এটি এক যুগ পরিবর্তনের সূচনা।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.