জঙ্গল সলিমপুর: ৩০ হাজার কোটি টাকার ভূমি আর সন্ত্রাসের অঘোষিত সাম্রাজ্য
চট্টগ্রাম নগরের একেবারে গা ঘেঁষে, অথচ কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ভয়ংকর জনপদ জঙ্গল সলিমপুর। এখানে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি সাধারণ কোনো পাহাড়ি এলাকা নয়। লোহার গেট, পাহারাদার, পাহাড়ের ঢালে ঢালে নজরদারি আর অপরিচিত মুখ দেখলেই চারদিক থেকে সন্দেহভরা দৃষ্টি। পরিচয় ছাড়া প্রবেশ কার্যত অসম্ভব।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত প্রায় ৩ হাজার একর সরকারি খাসজমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই এলাকা আজ একটি অঘোষিত সন্ত্রাসী ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এই জমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পদের দখল, বিক্রি ও নিয়ন্ত্রণ ঘিরেই এখানে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ বসতি, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
পাহাড় কেটে গড়া ছায়া অর্থনীতি
চার দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। পাহাড় সমতল করে প্লট বানানো, সেগুলো বিক্রি করা, বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ দেওয়া এবং এসবের বিনিময়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় এখন নিয়মিত ব্যবসা। পুরো এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে একটি ছায়া অর্থনীতি, যার নিজস্ব নিয়মকানুন ও সশস্ত্র পাহারা বাহিনী রয়েছে।
বাসিন্দাদের জন্য চালু রয়েছে আলাদা পরিচয়পত্র ব্যবস্থা। বাইরের কেউ এলেই বাসিন্দাকে গেট পর্যন্ত এসে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। প্রশাসনের গাড়ি প্রবেশ করলেই মুহূর্তের মধ্যে পাহারাদারদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ শুরু হয়।
প্রশাসনের জন্য ভয়ংকর এলাকা
এই এলাকাটি জাতীয় আলোচনায় আসে একাধিকবার, যখন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানা পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ককটেল ও ইটপাটকেলে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
২০২৪ সালের শেষদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিককে মারধরের ঘটনাও ঘটে। মামলা হলেও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চলতি জানুয়ারিতে। অস্ত্র উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন সদস্য। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে শত শত লোক জড়ো করে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি ও ইটপাটকেল ছোড়া হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সন্ত্রাসী বাহিনীর ভেতরের দ্বন্দ্ব
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এই অঞ্চলে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয়। নব্বই দশকে পাহাড় দখলের সূচনা হলেও সময়ের সঙ্গে বাহিনীগুলো বিভক্ত হয়ে আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। জমি দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে বহুবার।
২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত এক ডজন বড় সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। দেশি ও বিদেশি অস্ত্রের ব্যবহার এখানে নিয়মিত ঘটনা।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি দুর্বলতার কারণে বারবার অভিযান হলেও পুনরায় দখল হয়ে যায়। প্রশাসনের উদ্যোগ টেকসই হয়নি। সরকারি খাসজমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ একাধিক প্রকল্পের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি দখলদারদের প্রতিরোধে।
বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গল সলিমপুর এখন কেবল একটি পাহাড়ি এলাকা নয় এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে একদিকে রাষ্ট্রীয় আইন চলে, অন্যদিকে চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব আইন।
রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তার নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাহিনীগুলো বলছে, এলাকা থেকে সন্ত্রাস নির্মূলে কঠোর ও সমন্বিত অভিযান চালানো হবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে একটি রাষ্ট্রের ভেতরে কীভাবে বছরের পর বছর এমন একটি ভূখণ্ড গড়ে উঠতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতিই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জঙ্গল সলিমপুর আজ শুধু চট্টগ্রামের সমস্যা নয় এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, আইন ও নিরাপত্তার সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি।
বায়ান্ননিউজ২৪/সৈকত
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.