রাজনীতির নৈতিক অবক্ষয়ে প্রতিপক্ষ এখন মরণশত্রু: বদিউল আলম মজুমদার
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শের জায়গা দখল করেছে অর্থ, পেশিশক্তি ও সহিংসতা। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রাজনীতিবিদরা একে অপরের জন্য মরণশীল শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) খুলনায় ‘জুলাই অভ্যুত্থান, জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, জুলাই সনদের ৮৬টি বিষয়ের মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি বিষয় সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব বিষয়ে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে একসঙ্গে ৪৮টি বিষয় অনুমোদিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনের পথ উন্মুক্ত হবে। তিনি বলেন, এটি হবে একটি প্যাকেজ গণভোট এবং এতে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।
তিনি আরও বলেন, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন হলেই যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে, তা নয়। টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। গত কয়েক দশকে দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। রাজনীতি এখন বহুলাংশে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতির এই ব্যবসায়ীকরণের ফলে আদর্শের পরিবর্তে কালো টাকা ও পেশিশক্তি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার মূল হাতিয়ার।
ড. বদিউল বলেন, যুক্তি ও তর্কের বদলে হুন্ডা, গুন্ডা ও সহিংসতা এখন রাজনীতির ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই পরিণতিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছলে বলে কৌশলে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছে। ক্ষমতাসীনরা প্রায়শই বৈধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করছে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে গণতন্ত্র কখনও টেকসই হবে না।
সংলাপে খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ভোট ও সংস্কার বিষয়ে সুজনের এই আয়োজন সময়োপযোগী ও গঠনমূলক। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এবার সংঘাতহীন ও তুলনামূলকভাবে সহিংসতামুক্ত নির্বাচন প্রত্যাশা করা যায়। জুলাই সনদ বিষয়ে বিএনপি ইতোমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকার প্রভাব রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং বিএনপি বিষয়টি মোকাবিলায় সচেতন রয়েছে।
খুলনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তারা প্রচার শুরু করেছেন। দলীয় প্রচারের পাশাপাশি গণভোটের বিষয়টি জনগণের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন, ব্যয়সীমা কমানো এবং নারীর ক্ষমতায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
খুলনা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহফুজ রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন না হলে আজকের এই রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, জাতি আর গুম, খুন, চাঁদাবাজি ও বৈষম্য দেখতে চায় না। জনগণ ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠা দেখতে চায়। তার মতে, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থবহ হবে না এবং জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করাই হবে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
সংলাপে বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংস্কার এবং নৈতিক রাজনৈতিক চর্চার বিকল্প নেই।
বায়ান্ননিউজ২৪/সৈকত
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.