চরম মানবাধিকার সংকটে বাংলাদেশ
২০২৫ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সাংবাদিক নির্যাতন, মব ভায়োলেন্স এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দেশটি এক গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছেন। মোট ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, বাম সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরাও রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৫৪টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে অন্তত তিনজনের এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৫০০ জন।
সাংবাদিক হত্যা নয়, তবে ভয়াবহ নির্যাতন
সাংবাদিকদের বিষয়ে প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকরভাবে “৫৩৯ সাংবাদিক নিহত” বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা নিহত নয়। HRSS ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী—
২০২৫ সালে ৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন,
তবে ৫৩৯ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছেন—যার মধ্যে রয়েছে হামলা, মারধর, হুমকি, হয়রানি, গ্রেপ্তার, মামলা ও পেশাগত কাজে বাধা।
এই সময়ে ৩১৮টি ঘটনায় সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হন। ১০৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
সরকারের ব্যর্থতা ও মদদের অভিযোগ
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে সরকারের ব্যর্থতা এবং কিছু ক্ষেত্রে নীরব মদদ বড় ভূমিকা রাখছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগ নিয়ে উগ্রপন্থী ও সহিংস গোষ্ঠীগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
মব ভায়োলেন্সের ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন। চুরি, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের নামে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধপন্থীদের ওপর হামলা-মামলা বেশি
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তি ও সংগঠনের সদস্যদের ওপর হামলা ও মামলা তুলনামূলকভাবে বেশি। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এসব গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গণগ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলার প্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অন্তত ২৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আসামি মিলিয়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে ৫৪ হাজারের বেশি মানুষকে। অধিকাংশ গ্রেপ্তারই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
উগ্রপন্থা ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড
উগ্রপন্থী সংগঠনের তৎপরতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ও আহতের সংখ্যাও বাড়ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে সতর্কবার্তা
HRSS-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন,
“আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।”
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, সাংবাদিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংখ্যালঘু ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করা গেলে বাংলাদেশ আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।
বায়ান্ননিউজ২৪/নিউজরুম এডিটর
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.