পাকিস্তানের আকাশসীমায় অসুস্থ যাত্রীর মৃত্যু, জরুরি অবতরণ না করায় প্রশ্নের মুখে বিমান বাংলাদেশ
সিলেট থেকে লন্ডনগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে পাকিস্তানের আকাশসীমায় এক যাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও জরুরি অবতরণ না করায় তার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে পাইলটের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে এবং তদন্তের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট পাইলট।
গত ৩১ ডিসেম্বর সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট বিজি–২০১ পাকিস্তানের আকাশসীমায় লাহোরের কাছাকাছি পৌঁছালে এক যাত্রী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে উঠলে কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। তবে কাছাকাছি লাহোর বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ না করে পাইলট ফ্লাইটটি ঢাকায় ফেরত আনার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর ঢাকায় অবতরণের পর সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, মেডিক্যাল ইমার্জেন্সির ক্ষেত্রে নিকটবর্তী বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তে বিমানের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের প্রধানসহ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে যাত্রীর মেডিক্যাল ফিটনেস, ইন-ফ্লাইট ফার্স্ট এইড ব্যবস্থা, পাইলটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং জরুরি অবতরণ এড়ানোর যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও ২০২৩ সালে একই রুটে লন্ডনগামী বিমানে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখনও জরুরি অবতরণ না করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় বিমান বাংলাদেশের মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় বায়ুচাপের পরিবর্তন, কেবিন প্রেসার, ঝাঁকুনি এবং মানসিক চাপ অনেক রোগীর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক বা দীর্ঘদিন অসুস্থ যাত্রীরা এসব ধকল সহ্য করতে পারেন না। তাই যাত্রার আগে স্বাস্থ্যগত তথ্য গোপন না করার বিষয়ে যাত্রীদের বারবার সতর্ক করা হয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স অসুস্থ বা বয়স্ক যাত্রীদের ক্ষেত্রে ‘ফিট টু ফ্লাই’ সনদ বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু বাস্তবতায় বিমান বাংলাদেশ অনেক সময় যাত্রীদের ফেরাতে পারে না। ফলে কেউ কেউ অসুস্থতার তথ্য গোপন করেই দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটে উঠে পড়েন।
এ ঘটনার পর যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা বলছেন, লন্ডনগামী ফ্লাইটে এমন মৃত্যুর ঘটনা বারবার ঘটায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা কমছে। তারা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটে যাত্রী নিরাপত্তা, মানবিক দায়িত্ব এবং এয়ারলাইন্সের জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তদন্তের ফলাফলের দিকে এখন তাকিয়ে আছে দেশ ও বিদেশে থাকা হাজারো যাত্রী পরিবার।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.