২০২৫ সালে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসে নিহত ১৯৭

প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারী, ২০২৬ ১৩:২১ (সোমবার)
২০২৫ সালে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসে নিহত ১৯৭

২০২৫ সালে দেশে মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনিতে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন।আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রকাশিত সর্বশেষ মানবাধিকার প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।২০২৪ সালে যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ১২৮, সেখানে এক বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে।

আসকের তথ্যানুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৯৩ জন।নিহতদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হামলার শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হামলা

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মব সন্ত্রাসের শিকারদের বড় অংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয়, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা কিংবা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অনেককে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার সুযোগ নিয়ে মব তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে।এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

 

মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের ওপর হামলা

আসকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।কয়েকটি ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকাশ্যে হেনস্তা, মারধর এমনকি জুতার মালা পরানোর মতো অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে।

মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং রাষ্ট্রের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই আঘাত করার শামিল।কিন্তু এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

অঞ্চলভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যান

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী,

ঢাকায় ২৭ জন

গাজীপুরে ১৭ জন

নারায়ণগঞ্জে ১১ জন

চট্টগ্রামে ৯ জন

কুমিল্লায় ৮ জন

ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে ৬ জন করে

লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে ৫ জন করে

নরসিংদী ও যশোরে ৪ জন করে নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে অন্তত ৭ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য, ৩ জন নারী এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন।এতে স্পষ্ট হয় যে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয়েছে।

 

মব সহিংসতার কারণ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব, ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মব সন্ত্রাসের মূল কারণ।‘তওহীদী জনতা’সহ বিভিন্ন নামে সংগঠিত হয়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পসাহিত্য সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর এবং নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে।

 

আইনশৃঙ্খলা ও বিচারহীনতা

২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৩৮টি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে।এর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ, হেফাজতে নির্যাতন ও তথাকথিত গুলিতে নিহত হন ২৬ জন।থানায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২টি।

একই বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১০৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়।এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় নিহত হন ১০২ জন এবং আহত হন প্রায় ৪ হাজার ৮৪৪ জন।

 

সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।আইনের শাসন নিশ্চিত না করে রাজনৈতিক সমীকরণ ও আপসের পথে হাঁটার ফলেই সহিংসতা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলা রোধে সরকার কার্যকর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়নি।বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীরবতা হামলাকারীদের উৎসাহিত করেছে।

আসক বলছে, যদি দ্রুত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

 বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.