ইউনুস সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, বোয়িং থেকে ১৪ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে।সমালোচকদের দাবি, অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতেই প্রয়োজন ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বার্ষিক সাধারণ সভায় সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেনা হবে ৮টি সুপরিসর বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ন্যারো বডির বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ।
গত দুই বছর ধরে বিমান কোন কোম্পানির উড়োজাহাজ কিনবে তা নিয়ে আলোচনায় ছিল ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস ও মার্কিন কোম্পানি বোয়িং।এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ইউরোপ থেকে ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রকাশ্যেই সেই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এয়ারবাস সংক্রান্ত সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ে।এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি সামনে আসে।ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পরই অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিমান সূত্র জানায়, শুল্ক যুদ্ধের সম্ভাব্য চাপ এড়াতেই গত জুলাই মাসে বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেওয়া হয়।সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের সভায় সেই তালিকা কমিয়ে ১৪টিতে আনা হলেও বোয়িং থেকেই কেনার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
এদিকে এয়ারবাসকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় দেশগুলো অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।নভেম্বর মাসের শুরুতে ঢাকায় ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে বাংলাদেশকে এয়ারবাসকে যৌক্তিকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান।তারা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ইউরোর রপ্তানি, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সুবিধা এবং শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি বারবার সামনে আনেন।
২৬ নভেম্বর ঢাকায় এক সভায় জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটৎস সরাসরি সতর্ক করে বলেন, এয়ারবাস কেনার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বোয়িং ও এয়ারবাস উভয়ের প্রস্তাব থাকলেও সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর বোয়িংই চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যায়।তার মতে, সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে কূটনৈতিক চাপের ফল।
সমালোচকরা বলছেন, বিমানের বহর সম্প্রসারণের বাস্তব প্রয়োজন, রুট সক্ষমতা ও আর্থিক ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।তাদের অভিযোগ, ইউনুস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ রাখতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে গৌণ করছে।
যদিও বিমান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সংস্থাটি টানা পঞ্চমবারের মতো লাভের ধারায় রয়েছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা হয়েছে ৭৮৫ কোটি টাকার বেশি।তবে প্রশ্ন উঠেছে, লাভের এই অবস্থায়ও বিদেশি চাপের মুখে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যৌক্তিক।
বিশ্লেষকদের মতে, বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনা শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও বাজার সুবিধায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.