কথা রাখেননি ইউনুস, ১৫ মাসেও সম্পদের হিসাব দেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার
ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টা নিজেদের আয় ও সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। তিনি বলেছিলেন, এই সরকার হবে স্বচ্ছতার উদাহরণ, যেখানে দুর্নীতির কোনো জায়গা থাকবে না। সেই বক্তব্যে দেশজুড়ে তখন ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। বহু মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, এবার সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা ফিরবে।
কিন্তু সময় গড়িয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতির আজ প্রায় ১৫ মাস পার হয়ে গেছে। অথচ এখনো পর্যন্ত একজন উপদেষ্টাও তার আয় ও সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। এমনকি যারা এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন, তাদেরও কোনো হিসাব দেয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই প্রতিশ্রুতি কি আদৌ রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছিল, নাকি তা ছিল কেবল জনমত সামাল দেওয়ার কৌশল?
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেছিলেন, “আমাদের সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সকল সরকারি কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে।” ওই বক্তব্যের পর সরকারিভাবেই একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়। তাতে বলা হয়, প্রতিবছর আয়কর জমা দেওয়ার শেষ সময়ের পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ জমা দিতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—সেই নীতিমালার কোনো বাস্তব প্রয়োগ আজও দেখা যায়নি। এক বছরের বেশি সময় পার হলেও সরকার প্রকাশ্যে জানায়নি একজন উপদেষ্টাও সম্পদের হিসাব দিয়েছেন কি না। বরং এ সময়ের মধ্যে একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিশেষ করে কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লেনদেন, বদলি–বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করলেও তার অগ্রগতি জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। তদন্ত হয়েছে কি না, হলে কোথায় গিয়ে থেমেছে—এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন, তারা দায়িত্ব ছাড়ার আগে বা পরে তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—যদি লুকানোর কিছু না থাকে, তাহলে হিসাব দিতে এত অনীহা কেন?
এই সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে তিনজনের পদত্যাগ ইতোমধ্যেই হয়েছে। ছাত্র প্রতিনিধিত্বকারী এই তিন উপদেষ্টা ক্ষমতায় থেকে জনগণের পক্ষেই কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই পরেও স্বচ্ছতার সবচেয়ে মৌলিক শর্তটি পূরণ করেননি।
তারা হলেন—
নাহিদ ইসলাম, যিনি তথ্য এবং সম্প্রচার ও ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক পথে যাত্রা শুরু করেন।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের পদত্যাগপত্র প্রধান উপদেষ্টার নিকট জমা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এটি ছিল একটি বড় সুযোগ—আগের সরকারগুলোর দুর্নীতি ও গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একাধিকবার বলেছেন, সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। তার ভাষায়, “যদি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কেন করা হচ্ছে না? তাহলে কি লুকানোর কিছু আছে?”
সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও একই সুরে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল স্বচ্ছতার নজির গড়ার, কিন্তু সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের স্থবিরতা এবং সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা—সব মিলিয়ে সরকারের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে দিচ্ছে। জনগণের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর আস্থাহীনতা।
বিশ্লেষকদের মতে, যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছ থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা আশা করে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক।
আজ প্রশ্ন উঠছে—এই সরকার কি আদৌ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে? নাকি ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্তই সেই প্রতিশ্রুতি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.