সংখ্যালঘু ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করল ভারত

প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৩:৪৭ (মঙ্গলবার)
সংখ্যালঘু ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করল ভারত

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। দেশটির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংঘটিত প্রায় ২৯০০টি সহিংস ঘটনার তথ্যকে ‘মিডিয়ার অতিরঞ্জন’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চরমপন্থিদের ধারাবাহিক সহিংসতা গভীর উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ময়মনসিংহে এক হিন্দু যুবককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের।

তিনি বলেন, আমরা আশা করি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।

রণধীর জয়সওয়াল জানান, স্বতন্ত্র বিভিন্ন সূত্র অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার ৯০০টি সহিংস ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ভূমি দখলের মতো ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনাকে কেবল গণমাধ্যমের অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার ভিত্তিতেই করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উত্তেজনা

ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার দাবি করে আসছে, দেশটিতে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, তার অনেকগুলো রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সেগুলোকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে তার মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত। ঘটনার পর দেশটিতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

এর পরপরই ভারতে বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশি মিশন ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ হয় এবং কূটনৈতিক এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় হাই কমিশনারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলে ঢাকা।

শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। তবে ভারত সরকার দাবি করেছে, এসব ঘটনায় বড় ধরনের নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটেনি এবং পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ সরকার বলছে, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক নয়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে দেশের সরকারের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করা হয়।

উত্তেজনা ও বিক্ষোভ

দীপু দাস হত্যার পর বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়। ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ঠেকিয়ে দেয় পুলিশ। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাতেও বিক্ষোভ হয়।

এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাই কমিশনারের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান

রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির ওপর ভারত নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নিয়মিতভাবে ঢাকাকে জানানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে ধরনের বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়ানো হচ্ছে, ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায় বাংলাদেশের সরকারেরই।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত সবসময় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয় নয়াদিল্লি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশে একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

সংখ্যালঘু ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি বাড়লেও উভয় পক্ষই শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বচ্ছ তদন্ত, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং কূটনৈতিক সংযম এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

বায়ান্ননিউজ২৪/আসিফ

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.