বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু: ৫০ বছরে বিস্ময়কর অগ্রগতি
স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে প্রায় ২৬ বছর। এক সময় যেখানে গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর, সেখানে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ দশমিক ৪ বছরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অগ্রযাত্রা কিছুটা থমকে গেছে। কোভিড ১৯ মহামারি, বায়ুদূষণ, দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্যখাতের বিবর্তন
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগে বিপর্যস্ত একটি দেশ। তখন প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় ২০০ জন পাঁচ বছর পূর্ণ করার আগেই মারা যেত। স্বাস্থ্যসেবা ছিল সীমিত, টিকাদান ও ওষুধের সুযোগ ছিল অপ্রতুল।
আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, টিকাদান কর্মসূচি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং নারীদের শিক্ষায় অগ্রগতির ফলে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের উন্নতি ঘটে।
সময়ভিত্তিক গড় আয়ুর পরিবর্তন
১৯৭১ সালে গড় আয়ু ছিল ৪৬ বছর
১৯৮০ সালে বেড়ে হয় ৫২ বছর
১৯৯০ সালে দাঁড়ায় ৫৭ বছর
২০০০ সালে পৌঁছায় ৬৫ বছরে
২০১০ সালে হয় প্রায় ৭০ বছর
২০২৩ সালে গড় আয়ু দাঁড়ায় ৭২ দশমিক ৪ বছরে
এই অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসা।
কেন বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু
শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস
১৯৯০ সালে যেখানে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ৮৭ জন, বর্তমানে তা কমে এসেছে প্রায় ২৭ জনে। টিকাদান কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা এর মূল কারণ।
স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার
১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে গেছে। এর ফলে প্রাথমিক চিকিৎসা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।
নারীর শিক্ষা ও সচেতনতা
নারীদের শিক্ষার হার বাড়ায় পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি এবং মাতৃত্বকালীন যত্নে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিশুর স্বাস্থ্য ও আয়ুতে।
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা
সবুজ বিপ্লব, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে খাদ্য সংকট অনেকাংশে কমেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেন গড় আয়ু কমছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গড় আয়ু বৃদ্ধির গতি স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গড় আয়ু ছিল ৭২ দশমিক ৮ বছর, যা ২০২৩ সালে নেমে আসে ৭২ দশমিক ৪ বছরে।
প্রধান কারণসমূহ
কোভিড ১৯ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
গবেষকদের মতে, কোভিডে সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের বিস্তার
বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশের বেশি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও স্ট্রোকে হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও মানসিক চাপ এর জন্য দায়ী।
বায়ুদূষণ
এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের বায়ুদূষণ মানুষের গড় আয়ু প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে সীমিত বরাদ্দ
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক নয় শতাংশ। ফলে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার বড় অংশ নিজ খরচে বহন করতে হয়।
বৈষম্যের চিত্র
শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য স্পষ্ট। শহরে চিকিৎসার সুযোগ বেশি হলেও দূষণ ও মানসিক চাপ বেশি। অন্যদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনও বিশেষায়িত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
আঞ্চলিকভাবেও পার্থক্য রয়েছে। সিলেট, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে গড় আয়ু তুলনামূলক বেশি হলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামে বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুহার বেশি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌসী রহমান বলেন,
বাংলাদেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যখাতে বড় সাফল্য অর্জন করেছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘমেয়াদি অসুখ ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলেন,
গড় আয়ুর উন্নতির পেছনে চিকিৎসার পাশাপাশি নারী শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্যানিটেশনের বড় ভূমিকা রয়েছে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি উপজেলায় স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি বাস্তবায়ন
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ করা
মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা
শেষকথা
বাংলাদেশের গড় আয়ু বৃদ্ধির গল্প এক অর্থে সাফল্যের গল্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ কীভাবে অল্প সময়ে জনস্বাস্থ্যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তবে নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জও জটিল।
বায়ুদূষণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, মানসিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ মোকাবিলায় কার্যকর নীতি না নিলে এই অগ্রগতি থেমে যেতে পারে। সঠিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আগামী দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৫ বছর অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র:
১। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো
২। বিশ্বব্যাংক
৩। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
৪। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স
৫। আইসিডিডিআরবি গবেষণা প্রতিবেদন
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.