ছোটগল্প: লালাখালের নীল রহস্য
তানিয়া যখন সিলেটে পা রাখলো, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি। ঢাকার প্রচন্ড গরম আর বাসভ্রমণের ক্লান্তির পর এই ঠান্ডা বাতাস যেন আশীর্বাদ মনে হচ্ছিল। আহসান ওকে রিসিভ করতে স্টেশনেই দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ছোট্ট ছাতা।
“তুমি তো বলেছিলে, সিলেট সবসময় রোদেলা থাকে!” ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল তানিয়া।
“এই শহরের মতোই এর আবহাওয়াও একটু রহস্যময়। তবে আমি তোমাকে আগেই বলেছি সিলেট কিন্তু বৃষ্টির শহর। আহসান হেসে জবাব দিল।
তানিয়া ও আহসান—বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। শুরুতে কেবল সাদাসিধে বন্ধুত্ব ছিল। তারপর সেই বন্ধুত্ব আর ‘সাধারণ থাকেনি। ক্লাসের অবসরে, লাইব্রেরির কোণায়, কিংবা ক্যাম্পাসের আড্ডায় কাটানো সময়গুলো ধীরে ধীরে রঙ পেতে থাকে।
কিন্তু কেউ কোনো দিন কিছু বলেনি। এক ধরণের নীরব চুক্তি ছিল যেন, ‘তুই থাক, আমি থাকি, কিছু না বললেই তো অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।’
সিলেটের এই ট্যুরটা আহসানের প্রস্তাবে।
“তুই শহর দেখতে দেখতে ক্লান্ত। চল, তোকে আমার শহর দেখাই। একদিনে প্রেমে পড়ে যাবি।”
জাফলং
তারা প্রথমে গেল জাফলং। চা-বাগান আর পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছপানি আর চুনাপাথরের সেই জায়গা যেন সরাসরি কোনো ছবির বই থেকে উঠে এসেছে। নৌকা করে পিয়াইন নদী পার হয়ে তারা পৌঁছাল পাথরের রাজ্যে।
তানিয়া নিচু হয়ে পানিতে হাত ভিজিয়ে বলল, “এই জায়গাটা ঠিক যেন মন ছুঁয়ে যায়।”
আহসান জানাল, “এই নদীর ওপারেই মেঘালয়। ভারতে সীমান্তের খুব কাছে। এসব পাথর সেখান থেকেই আসে বর্ষায়।”
তানিয়া ক্যামেরায় ছবি তুলছিল, হাসছিল, মাঝে মাঝে আহসানের দিকে তাকিয়ে থাকত একটু বেশিক্ষণ। আহসান সেটা খেয়াল করলেও কিছু বলত না। শুধু চোখে সেই চিরচেনা মুগ্ধতা আর মুখায়বে প্রশান্তির রেশ।
রাতারগুল
পরদিন তারা গেল রাতারগুল। দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট। সবুজে র্পূণ, জলে ভাসমান বন। ছোট নৌকায় করে তাদের জলাভূমি ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো কিশোর মাঝি।
নৌকায় বসে তানিয়া প্রশ্ন করল, “তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?”
আহসান একটু চুপ করে থাকল, তারপর বলল, “ভালোবাসা ব্যাপারটা বাক্য দিয়ে বোঝানো কঠিন। কাউকে খুব ভালো লেগে যায়, তার চুপ থাকা, তার চোখের ভেতর খোঁজ করা যায় নিজের নিঃশ্বাস… কিন্ত কখনও বলা হয়ে ওঠে না। বললে অনেক সময় সব বদলে যায়।”
তানিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বলল না কিছুই। শুধু হাতের আঙুল দিয়ে নৌকার কোল বেয়ে জলের রেখা আঁকছিল।
লালাখাল
তারা যখন লালাখাল পৌঁছায়, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুই ছুই। খালের পানির স্বচ্ছতা এতটাই যে নদীর নিচের বালি স্পষ্ট দেখা যায়, আর রোদ পড়ায় তা নীলচে দেখায়। পাহাড় ঘেরা নদী, পাশে সবুজ, আকাশে ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ, কি স্বর্গীয় অনুভূতি।
তারা দুজন একটি কাঠের নৌকা ভাড়া করেছিল । নৌকায় বসে শুধু নদীর পানির শব্দ, মাঝেমধ্যে পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ, আর অনেক না-বলা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে।
তানিয়া ক্যামেরা দিয়ে নদী, আকাশ, আহসানের ক্লোজআপ—সবই ক্যাপচার করছিল। হঠাৎ আহসান বলল,
“চোখ বন্ধ করো।”
তানিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কেন?”
“আমাকে বিশ্বাস করো। একবার চোখ বন্ধ করো।”
তানিয়া চোখ বন্ধ করল। বাতাসে ওর চুল উড়ছে, নীল জলরাশি থেকে বালুর অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসছে।
আহসান বলল,
“একবার মনে করো, এই নদীর মাঝে তুমি একা। পেছনে যা ছিল, সব ছেড়ে এসেছো। সামনে শুধু অজানা পথ। এখন যদি বলি, এখানেই রয়ে যাও — পরিবার, শহর, ক্যারিয়ার, ব্যস্ততা সব ফেলে—থাকবে?”
তানিয়া আস্তে আস্তে চোখ খুলে তার দিকে তাকালো।
“তুমি বুঝতে পারো না আহসান, আমি তো বহু আগে থেকেই রয়ে গেছি। শুধু বলিনি। কারণ জানতাম, তুমি এই নদীর মতো। শান্ত, গভীর, এবং কিছুটা দূরের। তোমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনি কখনও।”
আহসান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“তুমি জানো, লালাখালের পানি কেন এত নীল?”
“না, জানি না।” — তানিয়া মাথা নাড়ল।
“কারণ এখানে সূর্য নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দেয়। আর নদী সেটা ধারণ করে নিরবে। আমি সেই নদী, তানিয়া। তুমি সূর্য হয়ে এসেছো, আলো দিয়ে গেছো। আমি শুধু গ্রহণ করেছি।”
তানিয়া ধীরে হাত বাড়িয়ে আহসানের হাত ধরল।
“তাহলে এবার নদীকে একটু কথা বলতে দাও। আমি এখানে শুধু আলো দিতে আসিনি। আমি…থাকতে চাই, যদি নদী চায়।”
সেই মুহূর্তে নৌকার মাঝি বৈঠা দিয়ে পানি ঠেলে দিচ্ছিল, একটা ছিপছিপে শব্দ হচ্ছিল। দূরে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছিল। আকাশে ছড়ানো গোধূলির রঙ, আর পানিতে তার প্রতিবিম্ব—সব মিলে যেন সময় থমকে গিয়েছিল।
তারা দুজনই চুপ ছিল। কিন্তু সে নীরবতার একটা ভাষা ছিল। সমস্ত জড়তা কেটে গিয়ে, সেদিন এক নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল একটি বিশ্বাসের পূর্ণতার, একটি প্রতিশ্রুতির, আর একটি নিঃশব্দ ভালোবাসার।
২য় অধ্যায়: ফিরে দেখা নীল
পাঁচ বছর কেটে গেছে।
তানিয়া জানে এই পাঁচ বছর কতটা লম্বা আর ভারী ছিল তার জন্য। প্রতিটি দিন তার কাছে একেকটা বিষাদে পূর্ণ চিঠির মতো মনে হতো—যার প্রতিটি লাইনে লেখা আছে: “সে আর নেই।”
আহসান মারা গেছে।
প্যারিসের এক সন্ধ্যায়, সাবওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তারা দুজন যখন ছোট ছেলেটিকে সাথে নিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিল, তখনই সেই ভয়ানক ঘটনাটি ঘটে। মুখোশধারী কয়েকজন ‘ব্রাউন মাঙ্কি বলে চিৎকার করে ছুরি নিয়ে তেড়ে আসে। আহসান তানিয়া আর বাচ্চাটিকে আড়াল করতে গিয়েই…
বাকি গল্পটা তানিয়া আর বলে না কারও কাছে।
শুধু ছবিগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে চুপ করে বসে থাকে। সেই নীল নদী, সেই রাতারগুল, ক্যামেরায় ধারণ করা সেই জীবন্ত স্মৃতিগুলো।
দেশে ফেরার পরদিন তানিয়া ছুটে এসেছে সিলেটে। সঙ্গে তার সাড়ে ৬ বছরের ছোট্ট ছেলেটি, যার নাম আহসান নিজের নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছিল “নাহিয়ান আহসান”।
“মা, এটা কি আব্বুর শহর?”
নাহিয়ানের সরল প্রশ্নে তানিয়া চমকে ওঠে।
সে মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ বাবা। এই শহরে তোমার আব্বুর ছেলেবেলা, তার স্কুল, বন্ধু-বান্ধব, তার প্রিয় নদী ছিল। আর সবচেয়ে বেশি ছিল ছোট্ট সিলেট শহরের প্রতি তার মুগ্ধতা।”
নাহিয়ান বোঝে না মায়ের এসব কঠিন কথা। সে শুধু মায়ের চোখে পানি দেখতে পায়। ওর ছোট্ট হাত দিয়ে সে মায়ের চোখ মুছে দেয়।
সিলেটে দাদুর বাসায় থেকে তারা প্রথমে গেল জাফলং। সেই চা-বাগান, সেই পিয়াইন নদী, এখনো আগের মতোই আছে। কিন্তু আহসান নেই।
তানিয়া নৌকায় বসে নাহিয়ানকে বলল,
“এই নদীতে নেমে তোমার বাবা একটা সাদা পাথর কুড়িয়ে হাতে নিয়ে বলেছিল, ‘হে পাথর তোমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখবো একদিন।’”
নাহিয়ান হেসে বলল, “আমি আব্বুর গল্প হতে চাই!”
পরদিন তারা গেল লালাখাল।
এবারও তারা ছোট নৌকা ভাড়া করল। মাঝি একজন বয়স্ক লোক। তিনি বেশ গুরুগম্ভীর। নীরবে বৈঠা ঠেলে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে চললেন।
তানিয়া মনে মনে ভাবছিল, এখানেই সেই প্রশ্ন করেছিল সে: “তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?”
আর আহসান সেই রহস্যময় উত্তর দিয়েছিল—যেটা শুধু সে বুঝেছিল, আর কেউ না।
এই বন, এই জলে তারা একদিন একসাথে মিশেছিল। আজ সেই নদী আছে, স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি আছে, নৌকা আছে, নেই শুধু সেই মানুষটা।
তানিয়া স্মৃতিকাতর হয়ে ছেলেকে কোলে নিল। নড়াচড়ায় নৌকা একদিকে একটু কাত হয়ে গেলো। কিন্তু তানিয়ার সেদিকে কোন খেয়াল নেই।
আজ মনে হচ্ছে সূর্য একটু কম আলো দিচ্ছে। নাহিয়ান জিজ্ঞেস করল,
“এই নদীর পানি এত নীল কেন, মা?”
তানিয়া হেসে বলল।
“কারণ সূর্য এখানে নিজেকে উজাড় করে দেয়, বাবা। তোমার আব্বুর কথা।”
একটা মুহূর্তে সে একটা চিঠি বের করল। আহসানের হাতের লেখা। প্যারিস যাওয়ার আগে একদিন মজা করে লিখেছিল।
“যদি কোনোদিন আমি না থাকি, এই নদীটার কাছে যেও। ও জানে আমি কেমন করে ভালোবেসেছি। আর আমাদের সন্তান—ও যেন জানে, তার বাবা কেমন নীল ভালোবাসা রেখে গেছে এই পৃথিবীতে।”
তানিয়া চিঠিটা পড়ার পর ছেলের দিকে তাকাল।
“এই নদী তোমার বাবার মতো শান্ত, গভীর, আর ভালোবাসায় পূর্ণ। তুমি যদি ওকে একদিন ভীষণ মিস করো, জানবে, সে এখানেই আছে—এই বাতাসে, এই নীল জলে।”
নাহিয়ান কোনো কথা বলল না। তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে মায়ের হাত চেপে ধরল।
সূর্য ততক্ষণে লুকিয়ে পড়ছে পাহাড়ের আড়ালে। লালাখালের জলে রোদ মিলিয়ে যাচ্ছে ক্রমে।
তানিয়া চোখ বন্ধ করল।
আহসানের কণ্ঠ যেন আবার ভেসে এল—
“তুমি সূর্য হয়ে এসেছো… আমি শুধু ধারণ করেছি।”
লেখক: কথাসাহিত্যিক গোলাম রসুল খান।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.