নজিরবিহীন মবের মুখে রাবিতে আওয়ামীপন্থি ৬ ডিনের পদত্যাগ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নামে সৃষ্ট নজিরবিহীন মবের চাপে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আওয়ামী লীগপন্থী ছয় ডিন পদত্যাগ করেছেন। রোববার (২১ ডিসেম্বর) দিনভর বিক্ষোভ, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের কার্যালয়সহ প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং প্রশাসন অবরুদ্ধ করে রাখার পর রাতে তারা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসুদ রোববার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পদত্যাগ করা ডিনরা হলেন—
আইন অনুষদের অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক এস এম এক্রাম উল্যাহ, বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক নাসিমা আখতার, প্রকৌশল অনুষদের অধ্যাপক বিমল কুমার প্রামাণিক এবং ভূবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক এএইচএম সেলিম রেজা।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, রোববার দুপুর ১টার দিকে ডিনদের পদত্যাগের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন–এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির নেতাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর আগে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের ডিনদের কার্যালয়েও তালা দেওয়া হয়।
পরে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনা হয়। ডিনদের অপসারণের আশ্বাস দিলে সাময়িকভাবে তালা খুলে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় উপাচার্য জরুরি বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকের পরই ছয় ডিন লিখিতভাবে দায়িত্ব পালনে অপারগতার কথা জানান।
পদত্যাগ করা এক ডিন গণমাধ্যমকে বলেন,
“উপাচার্য আমাদের ডেকেছিলেন। আগেও মৌখিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না চাওয়ার কথা বলেছিলাম। আজ লিখিতভাবে অপারগতার কথা জানিয়েছি।”
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকেও পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত ১৮ ডিসেম্বর এসব ডিনের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও উপাচার্য নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তাদের মেয়াদ বাড়িয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার—যিনি ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে পরিচিত—এই ছয় ডিনের পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন।
‘জুলাই যোদ্ধা’ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এই দাবি আরও জোরদার হয়। ওইদিন সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার–এর বিভাগে যান এবং পরে প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দপ্তরে তালা দেন। সেখানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও দেখা যায়।
কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন রাকসুর সিনেট সদস্য আকিল বিন তালেব, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জায়েদ হাসান জোহা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মুজাহিদ ফয়সাল এবং ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা।
রোববার সকালে রাকসু ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে ডিনদের পদত্যাগপত্র হাতে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে একে একে ডিনদের ফোন করেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। একই সঙ্গে তিনি ডিনদের উদ্দেশে লেখা পদত্যাগপত্র প্রকাশ করেন।
পদত্যাগের বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এস এম এক্রাম উল্যাহ বলেন,
“এই পরিস্থিতিতে আমি ডিন থাকতে চাই না। উপাচার্যের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি।”
এদিকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহা. মাঈন উদ্দিন বলেন,
“ডিনদের অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আগেই চিন্তাভাবনা চলছিল। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আজ উপাচার্যের সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত ডিনদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করে প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করা এবং আলটিমেটামের মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা রাবির ইতিহাসে নজিরবিহীন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.