গণমাধ্যম ধ্বংস, মব সন্ত্রাস: বাংলাদেশ কি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে গেছে?

প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৩:৩২ (সোমবার)
গণমাধ্যম ধ্বংস, মব সন্ত্রাস: বাংলাদেশ কি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে গেছে?

লন্ডনের আকাশ তখন নিস্তব্ধ। শীতের কুয়াশা জানালার কাঁচে জমে আছে। কিন্তু মন পড়ে আছে হাজার মাইল দূরে ঢাকায়। ফোন স্ক্রিনে একের পর এক খবর। আগুন। ভাঙচুর। হামলা। আর্তনাদ। ঘুম আসছে না। ঘুমানোর কথা চিন্তাতেও আসছে না। কারণ আজকের এই রাত বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি কালো রাত হয়ে থাকবে।

প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আগুন। সাংবাদিকরা ধোঁয়ার মধ্যে আটকা। নারী সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্টে জীবন বাঁচানোর আর্তনাদ। এর ফলশ্রুতিতে শুক্রবার পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ। অনলাইন কার্যক্রম প্রায় অচল। এটি কেবল দুটি সংবাদপত্র বন্ধ হওয়া নয়। এটি একটি দেশের স্বাধীন কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।

এরপর ছায়ানটে হামলা। ভাঙচুর। আগুন। ছায়ানট বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মার প্রতীক। ভাষা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধ স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে যে প্রতিষ্ঠান গান দিয়ে মানুষকে সাহস দিয়েছে আজ সেই প্রতিষ্ঠানও নিরাপদ নয়।

এরপর আরও ভয়ংকর খবর। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। উদীচী কোনো সাধারণ সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়। এই সংগঠন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণমানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠাই ছিল এর জন্মলক্ষ্য। আজ সেই উদীচী পুড়িয়ে দেওয়া মানে ইতিহাসকে পুড়িয়ে দেওয়া।

ধানমন্ডি ৩২ এ বুলডোজার হামলা। এটি কোনো স্থাপনায় আঘাত নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের ভিত্তির ওপর আঘাত।

একই সময়ে নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরের ওপর বর্বর হামলার খবর আসে। যিনি সব আমলে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। সামরিক শাসন ধর্মীয় উগ্রবাদ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবিচল থেকেছেন। তার ওপর আক্রমণ মানে ভিন্নমতের শেষ বাতিঘরেও আঘাত।

এর সঙ্গে যোগ হয় খুলনায় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা। ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহে আগুন। প্রথম আলোর বিভিন্ন জেলা অফিসে হামলা। অর্থাৎ আগুন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

এই সব ঘটনার কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন। রাষ্ট্র কোথায়।

পুলিশ ছিল। প্রশাসন ছিল। কিন্তু কার্যকর ছিল না। সাংবাদিকরা বলছেন পুলিশ চেয়ে চেয়ে দেখেছে। পুলিশ বলছে চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আগুন নিভেনি। হামলা থামেনি। মানুষ নিরাপদ ছিল না।

দিনের পর দিন ধরে বলা হয়েছে এই মব সংস্কৃতি বন্ধ করুন। সরকারকে লেখা হয়েছে বলা হয়েছে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু শোনা হয়নি। আজ সেই অবহেলার ফল ভোগ করছে পুরো জাতি।

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। পাকিস্তান আফগানিস্তান সিরিয়া কোথাও রাষ্ট্র একদিনে ভেঙে পড়েনি। ভেঙেছে ধীরে ধীরে। প্রথমে গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে। তারপর সংস্কৃতি। তারপর সংখ্যালঘু। তারপর ভিন্নমত। আজ বাংলাদেশে সেই ধারাবাহিকতা ভয়ংকরভাবে দৃশ্যমান।

মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য। একটি মানবিক গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার জন্য। আজ সেই মুক্তিযুদ্ধ অবরুদ্ধ। আগুনের মধ্যে ভয়ের মধ্যে মবের দাপটে রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তায়।

এখনও সময় আছে। কিন্তু সময় খুব কম।

সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দোষীদের পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেপ্তার করতে হবে। গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াই হবে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা।

আর জনগণের প্রতি আবেদন। এই অস্থির সময়ে দায়িত্বশীল হোন। গুজবে কান দেবেন না। সহিংসতার পক্ষে দাঁড়াবেন না। যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন তারা ঐক্যবদ্ধ হোন।

লন্ডন থেকে বসে আজ এই কথাগুলো লেখা সহজ নয়। দূরে থাকলেও এই দেশ রক্তের মতো মিশে আছে। তাই ভয় লাগে। কষ্ট লাগে। লজ্জা লাগে।

গোলাম রসুল খান, এডিটর ইন চীফ, বায়ান্ননিউজ২৪।

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.