মহান বিজয় দিবসের অঙ্গীকার ইতিহাস রক্ষার শপথ
আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির আত্মগৌরব আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠার দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরাজিত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রম কোটি মানুষের আত্মত্যাগ আর গণবীরত্বের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় আজ ৫৪ বছরে পদার্পণ করেছে।
বিজয় দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়। এটি ইতিহাসের দায় স্মরণ করার দিন। পাকিস্তানি শাসনামলের শোষণ বঞ্চনা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জনগণকে সংগঠিত করার ভূমিকা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অসম্পূর্ণ।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ এই বিজয়ের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা এক গভীর উদ্বেগের মুখোমুখি। বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে হেয় করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা গণতন্ত্র সাম্য ও ন্যায়বিচার ক্রমশ আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ইতিহাসকে সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা শহীদদের আত্মত্যাগকে আপেক্ষিক করে তোলা এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও জনযুদ্ধের চরিত্রকে খাটো করার অপচেষ্টা জাতিকে বিভ্রান্ত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়াবহ একটি বাস্তবতা। জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিল আজ নতুন রূপে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় নেমেছে। গণহত্যা রাজাকারদের ভূমিকা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কলঙ্ক ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত প্রমাণ করার এই প্রচেষ্টা কেবল ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ওপরও আঘাত।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। সাধারণ মানুষই ছিল এর কেন্দ্রীয় শক্তি। সেই যুদ্ধে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এই সত্য অস্বীকার করা যায় না এবং মুছেও ফেলা যায় না। ইতিহাস বিশ্লেষণে মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করার কোনো অধিকার কারও নেই। যারা আজ ক্ষমতার ছত্রছায়ায় বা রাজনৈতিক সমীকরণে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসনের পথ তৈরি করছে তারা মূলত বিজয়ের চেতনার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কেবল পতাকা ও মানচিত্র নয়। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সেই লক্ষ্য এখনো পূর্ণ হয়নি এ কথা সত্য। কিন্তু অপূর্ণতার অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা বা খাটো করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সামনে রেখেই গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
আজকের দিনে তাই সবচেয়ে জরুরি অঙ্গীকার হলো ইতিহাস রক্ষা করা। মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবিচলভাবে ধারণ করা। বিজয়ের এই দিনে বায়ান্ননিউজ২৪ মনে করে ইতিহাসের সঙ্গে কোনো আপস নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
মহান বিজয় দিবসে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হোক আমাদের পথচলার একমাত্র দিশা।
গোলাম রসুল খান, এডিটর ইন চীফ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.