রিসেট বাটন চাপ, ‘নতুন বাংলাদেশ’ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি?
বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে ‘দখলদার বাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করাকে ঘিরে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে তীব্র সমালোচনা চলছে। ৪ ডিসেম্বর বিডিনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চার ঘণ্টার পরীক্ষার ‘মহানন্দা’ সেটে প্রথম প্রশ্ন ছিল: “১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।” পরীক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রশ্নের ভাষা দেখে বিস্মিত হন এবং এ নিয়ে আলোচনাও হয়।
অভ্যুত্থানের পর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সবচেয়ে বড় অর্জন—মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—সম্পর্কে নানা বয়ান হাজির করার প্রবণতা বেড়েছে। এসব নতুন বয়ানের ভেতরে এমন ইঙ্গিত রয়েছে, যেন মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ; বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসকামী; আর শহীদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশি নয়। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদানকে খাটো করা এবং মুক্তিযুদ্ধকে পুনর্বিবেচনার নামে বিকৃত করার চেষ্টা দেখা যায়। স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ও পরাজিত শক্তিগুলোর বহুদিনের বয়ানগুলো যেন আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে।
১৯৭১ সালের জুলাইেই অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ‘লাখ লাখ মানুষ’ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর মাত্র চার মাসের মাথায় এই হত্যাযজ্ঞের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবু আজ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কিছু গোষ্ঠী দাবি করছে যে শহীদের সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক খুব নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে এলেও এবারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে তুলে ধরা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন—৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা ‘আওয়ামী বয়ান’। অথচ যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই অনেক লেখক ও রাজনীতিকের বিবরণে ব্যাপক গণহত্যার কথা উঠে এসেছে—মওলানা ভাসানীর ১০ লাখ নিহতের উল্লেখ, আসাদ চৌধুরীর কবিতায় লাখো মৃত্যুর ইঙ্গিত, এবং তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ লাখ হত্যার তথ্য।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একজন বিদেশি সাংবাদিককে ৩০ লাখ শহীদের কথা বলেন। একই সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্রিকায় এই সংখ্যাই উল্লেখ ছিল। তাই আজ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উসকে দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে—এমন ধারণা অযৌক্তিক নয়।
বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নও এখন সেই ‘নতুন বয়ান’-এর সাথে সম্পর্কিত কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মুক্তিযুদ্ধের লড়াই ছিল প্রকৃত অর্থেই প্রতিরোধ যুদ্ধ, কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দ এড়িয়ে যাওয়া এবং ‘পাকিস্তানি হানাদার’ না বলে ‘দখলদার’ শব্দ ব্যবহার করা ইচ্ছাকৃত কি না—এমন সন্দেহও জনমনে রয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি গোষ্ঠীর প্রোপাগান্ডা কি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নেও প্রতিফলিত হচ্ছে?
এমনই সময়ে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের আলোচনায় একজন আইনজীবী বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাসঘাতক বলেন। উপস্থাপক প্রতিবাদ করায় তাকেও সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের প্রথম সারির প্ল্যাটফর্ম ছিল এই চ্যানেল, আর সেই উপস্থাপকই তখন নিহত মীর মুগ্ধকে স্মরণ করে কেঁদেছিলেন। আজ একই মানুষকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলা হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় আলোচনায় আসে ‘রিসেট বাটন’। অভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ভয়েস অব আমেরিকাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তরুণরা রিসেট বাটন চাপার কথা বলেছে—অতীতকে মুছে নতুন পথে এগোনোর কথা বলছে। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ মনে করেছেন, একাত্তর-পূর্ববর্তী অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ব্যাখ্যা দেয় যে, তিনি ইতিহাস মুছতে নয়—দুর্নীতি আর ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে নতুনভাবে গড়ার সংস্কারের কথা বলেছেন।
২৮ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আজকের বাংলাদেশ দেখলে বোঝা যায় না এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।” তার হতাশা থেকেই প্রশ্ন জাগে—এই কি তাহলে কথিত ‘নতুন বাংলাদেশ’? গত এক বছরে মুক্তিযুদ্ধ অবমাননা, ধর্মীয় উগ্রতার উত্থান—এসবই কি নতুন বাংলাদেশের চরিত্র?
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে ইতিহাসের বড় ঘটনা—জনগণের আন্দোলনে একজন শাসকের দেশত্যাগ বিরল নজির। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে ঘিরেও নানা বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে হেয় করা, শেখ হাসিনার শাসনের সমালোচনার আড়ালে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বকে গুলিয়ে ফেলা, বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে কটূক্তি—এসবের মধ্য দিয়েই যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, তার ভিত্তি কতটা দৃঢ়? কতটা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক? আর সেই বাংলাদেশের রূপটাই বা কেমন হবে—এ প্রশ্ন জনমনে থেকেই যাচ্ছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.