অদৃশ্য যুদ্ধ: ইউক্রেনের পর বাংলাদেশ কি প্রস্তুত

প্রকাশিত: ০৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২২:৩০ (সোমবার)
অদৃশ্য যুদ্ধ: ইউক্রেনের পর বাংলাদেশ কি প্রস্তুত

সাইফুর রহমান:

হঠাৎ একদিন সংবাদে দেখি ইউক্রেনে হামলা করেছে রাশিয়া। মিডিয়ার বদৌলতে জানলাম ঐটুকুই। রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি করা হলো এক ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি মানসিকতা। ঘরে ঘরে বিলি করা হলো যুদ্ধকালীন অবস্থায় করণীয় লিফলেট। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলো ন‍্যাটোতে যোগ দেয়ার। পেছনের হিসেব পরিষ্কার হলো ধীরে ধীরে। সকল প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল ইউক্রেনের লোকজনকে।

ইউক্রেন জানাল— তারা নাকি পাঁচটি রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। সেই দাবির সঙ্গে সঙ্গেই ন্যাটো রাশিয়াকে দিল হুমকি— ভয়ংকর প্রতিশোধ আসছে। অথচ একই সময়ে ইউক্রেনের ভেতরকার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন: যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, দেশ ডুবে আছে অন্ধকারে, রাস্তায় রাশিয়ার প্যারা ট্রুপার ঘোরাফেরা করছে, আর আতঙ্কে কাঁপছে সাধারণ মানুষ। তবু প্রশাসন নাগরিকদের বলছিল— স্যুটকেস গুছিয়ে রাখুন; দেশ ছাড়াই হয়তো একমাত্র ভবিষ্যৎ।

পরের ধাপে ইউক্রেন সামরিক আইন জারি করল, আকাশপথ বন্ধ করে শক্ত অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করল। কিন্তু এগুলো কোনোটাই রাশিয়ার অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারল না।

তারপর ইউরোপ দেখল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় বিধ্বংসী হামলা— এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। এই মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিল রাশিয়ার সম্পদ বাজেয়াপ্তের; ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাশিয়ার প্রবেশাধিকার বন্ধ হলো। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন— “এই যুদ্ধ পুতিনের বহু আগের পরিকল্পনা। রাশিয়া চরম নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে।”

এভাবেই ইউরোপ ও আমেরিকা বৈঠক থেকে বৈঠকে ছুটলো— নিষেধাজ্ঞা কোন খাতগুলোতে বাড়বে, কীভাবে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা যায়— এসবই ছিল তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু পর্দার আড়ালের সত্য তখন আর গোপন ছিল না:
এই যুদ্ধ অনেকদিন আগেই আঁকা নকশা অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল। পশ্চিমা যুদ্ধবাজ শক্তিগুলো বহু বছর ধরে ইউক্রেনকে যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত করার প্রস্তুতি নিয়েছে।

তারা ইউক্রেনের তরুণদের মন দখল করেছে প্রচারের মাধ্যমে—
“রাশিয়া তোমাদের শোষণ করছে; তোমাদের নেতারা রাশিয়ার দালাল। তাদের সরাও, প্রতিরোধ গড়ো।”

এই আবেগ, হতাশা ও স্বপ্নকে পুঁজি করে পশ্চিমা অর্থ ঢালা চলল। এর পেছনে সক্রিয় ছিল তিন শক্তি—
USAID, NED, Open Society Foundations, যাদের কাজই অন্য দেশের রাজনীতি পুনর্গঠন করা।

২০১৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইয়ানোকোভিচকে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ নাম দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। এরপর ২০১৯ সালে ক্ষমতায় বসানো জেলেনস্কি শেষপর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে দেশের অপরিমেয় খনিজসম্পদের দরজা খুলে দিলেন।

তার বিনিময়ে ইউক্রেনের মূল্যবান দুর্লভ খনিজ সম্পদ—
লিথিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, টাইটানিয়াম—
দিয়ে দেওয়া হলো আমেরিকাকে; যা আধুনিক জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য।
যুদ্ধের ধোঁয়ার আড়ালে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে গেল।

আর যারা স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল— সেই তরুণদের বহুজন আজ ইউরোপের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে উদ্বাস্তু হয়ে শুয়ে আছে।

এই যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রাপ্তি কী?

• ৪৬ হাজার মৃত সৈন্য— রাজনৈতিক দাবা খেলায় যাদের জীবন বলি হলো।
• ১ লক্ষ ৮০ হাজার পঙ্গু মানুষ— যাদের ভবিষ্যৎ আর কেউ বহন করবে না।
• ২০ হাজার সাধারণ নাগরিকের লাশ— যাদের মৃত্যু বহু বছর ধরে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে থাকবে।
• লাখো পরিবার ঘরহারা— কেউ ইউরোপমুখী, কেউ আশ্রয়শিবিরে।
• দেশের অর্ধেক খনিজসম্পদ বিদেশি দখলে।
• ভূখণ্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাশিয়ার হাতে চলে গেছে।

অবশেষে সত্যটা আজ পরিষ্কার দিনের আলোর মতো:
যুদ্ধ জেতেনি ইউক্রেন; জিতেছে সেই শক্তিগুলো, যারা সীমান্তে নয়— লাভের খাতায় যুদ্ধের হিসাব লেখে।

এ দৃশ্যটিকে এবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের জায়গায় ভারত ও বাংলাদেশ বসিয়ে কল্পনা করুন। ভবিষ্যতে বাস্তবতা মিললে মনে পড়বে— আগে থেকেই কেউ কেউ সাবধান করেছিল।

ইউক্রেনের অন্তত ইউরোপে যাওয়ার পথ আছে; কিন্তু বাংলাদেশের অপর সীমান্তের ওপারে চলমান মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +44 7440589342

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.