শক্তিশালী ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে ঢাকা-সিলেট
বাংলাদেশ একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। ভারতীয় এবং বার্মিজ টেকটোনিক প্লেটের সীমানায় থাকার কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কার মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যে কোনো সময় বৃহৎ মাত্রার ভূকম্পন আঘাত হানতে পারে এবং প্রচুর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অপ্রস্তুত নগরবাসীর কারণে প্রাণহানির সম্ভাবনা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চঝুঁকির জোনে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহের উত্তরের অঞ্চল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও নরসিংদীর কিছু অংশ। মাঝারি ঝুঁকির জোনে রয়েছে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বৃহৎ অংশ, আর নিম্নঝুঁকির জোনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ খুলনা, যশোর, বরিশাল ও পটুয়াখালী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা ও সিলেট একইসঙ্গে দুটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছে অবস্থিত হওয়ায় বড় কম্পনের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চমাত্রায় রয়েছে।
দেশের চারপাশে অন্তত পাঁচটি প্রধান ভূমিকম্প উৎস বা ফল্ট লাইন সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ডাউকি ফল্ট (ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট এলাকা), মধুপুর ফল্ট (ঢাকা-টাঙ্গাইল বেল্ট), চিটাগং টেকটোনিক বেল্ট, ইন্ডিয়া-মিয়ানমার সাবডাকশন জোন এবং সিলেট অঞ্চলে প্লেট বাউন্ডারি কার্যক্রম। বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট উদ্বেগজনক, কারণ কয়েকশ বছর ধরে বড় কম্পন ঘটেনি, যা “স্ট্রেস বিল্ডআপ”ের কারণে বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক সিলেটের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছিল। ১৯১৮, ১৯৩০, ১৯৫০ সালে একাধিক বড় ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্রভাবিত করেছে। সাম্প্রতিক দশকেও ১৯৯৭, ২০০৩ ও ২০১৫ সালে জোরালো কম্পন অনুভূত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে বাংলাদেশ উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প বেল্টে রয়েছে।
ঢাকায় প্রায় একুশ লাখ ভবনের মধ্যে প্রায় ছয় লাখ চার থেকে ত্রিশ তলা উঁচু, এবং বহু ভবনই বিল্ডিং কোড ছাড়া নির্মিত। পুরনো ঢাকার অধিকাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ঢাকা শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে ভবন নির্মাণে কোড না মানা, ঘনবসতি, সরু রাস্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উদ্ধার সক্ষমতার ঘাটতি। বিশ্বে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ভূকম্পন পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা প্রযুক্তিতে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড আগেই সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এখনও ব্যাপক সেন্সর নেটওয়ার্ক, আগাম সতর্কতা অ্যাপ বা জাতীয় পর্যায়ের রিয়েল টাইম সিস্টেম পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
বুয়েট বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা জরুরি ভিত্তিতে করা, পুরনো ও দুর্বল ভবন সংস্কার বাধ্যতামূলক করা, স্কুল পর্যায়ে ভূমিকম্প প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা, সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ফায়ার সার্ভিসসহ সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বিত দুর্যোগ পরিকল্পনা করা এবং বার্ষিক মহড়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা একমত যে বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশে ঘটবেই, প্রশ্ন শুধু কখন। ঝুঁকি কমাতে এখনই অবকাঠামো, উদ্ধার ব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণে বাড়তে পারে।
বায়ান্ননিউজ২৪/এডিটর ইন চীফ
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.