ইতিহাসে বাংলার যত ভূমিকম্প
গোলাম রসুল খান:
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ভূমিকম্পের ফলে রাজধানীসহ চট্টগ্রাম সিলেট রাজশাহী রংপুর খুলনা বরিশাল ময়মনসিংহে হালকা থেকে মাঝারি কম্পন টের পাওয়া যায়। যদিও বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি তবুও বিশেষজ্ঞরা আবারও সতর্ক করে বলেছেন যে বাংলাদেশ সক্রিয় ফল্টলাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজমান।
ভূমিকম্পবিদদের মতে কোনো অঞ্চলে সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ বছরের ব্যবধানে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশ এবং আশপাশের এলাকায় গত দুই শতকে একাধিক বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রায় এক শতাব্দী ধরে এখানে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে।
বাংলাদেশ অঞ্চলের ইতিহাসে বড় ভূমিকম্পসমূহ
১৫৪৮
লিখিত ইতিহাসে জানা যায় চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। মাটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এবং ফেটে ওঠা স্থান দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা পানি বের হয়। নির্দিষ্ট হতাহতের তথ্য পাওয়া যায় না।
১৬৪২
সিলেটে শক্তিশালী কম্পনে বহু দালান কোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায় না।
১৭৬২ চট্টগ্রাম ঢাকা ভূমিকম্প
আঠারো শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি।
চট্টগ্রামে বহু জায়গায় মাটি ফেটে কাদা পানির ফোয়ারা দেখা যায়। পর্দাবন এলাকায় একটি নদী শুকিয়ে যায় বলে উল্লেখ রয়েছে। বাকর চনক এলাকায় প্রায় দুই শত মানুষ এবং গৃহপালিত প্রাণী ভূগর্ভে তলিয়ে যায়। বহু গ্রাম দেবে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়। কথিত আছে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে ক্ষুদ্র অগ্ন্যুৎপাত সদৃশ ভূ প্রক্রিয়া দেখা গেছে।
ঢাকায় নদী এবং ঝিলে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পর তীর জুড়ে বিপুল মৃত মাছ দেখা যায়। বহু বাড়িঘর ধসে পড়ে। সার্বিকভাবে প্রায় পাঁচ শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
১৭৭৫ ও ১৮১২
১৭৭৫ সালে ঢাকায় এবং ১৮১২ সালে সিলেটে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সিলেটে কিছু দালান ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু প্রাণহানি ছিল না।
১৮৬৫ সীতাকুণ্ড ভূ ফাটল
এই বছর সীতাকুণ্ড পাহাড়ে ফাটলের মাধ্যমে বালি এবং কাদা নির্গত হয়। এটি ভূ প্রক্রিয়াগত দিক থেকে একটি বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
১৮৮৫ মানিকগঞ্জের বেঙ্গল আর্থকোয়েক
মাত্রা প্রায় ৭। উৎপত্তিস্থল ছিল সাটুরিয়ার কোদালিয়া। ভারত এবং মিয়ানমার পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়। বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে মৃতের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।
১৮৯৭ দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক
১২ জুন ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পটি এই অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনাশা হিসেবে বিবেচিত। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল প্রায় ৮।
সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল ছিল আসামের চেরাপুঞ্জির নিকটবর্তী অঞ্চল। বাংলা আসাম মেঘালয়সহ বিশাল এলাকা কেঁপে ওঠে।
সিরাজগঞ্জে প্রশাসনিক ভবন আদালত কারাগার ডাকঘরসহ অসংখ্য স্থাপনা ভেঙে পড়ে। বহু কুয়া বালু এবং পলিমাটিতে ভরে যায়। ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ফাটল দেখা দেয়। রেল এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সিলেট শহরের অধিকাংশ বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং বহু পাকা স্থাপনা ভেঙে পড়ে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী সিলেট জেলায় মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪৫। এ ভূমিকম্প স্থায়ী হয়েছিল অঞ্চলভেদে ছয় সেকেন্ড থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত যা ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
১৯১৮ শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প
মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬। শ্রীমঙ্গলে বহু স্থাপনা ধসে পড়ে। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারেও কম্পন অনুভূত হয়।
১৯৫০ আসাম ভূমিকম্প
মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৭। বিশ শতকের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প। বাংলাদেশে কম্পন অনুভূত হলেও বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
১৯৯৭ চট্টগ্রাম ভূমিকম্প
মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ০। চট্টগ্রাম শহরের বহু ভবনে ফাটল সৃষ্টি হয়।
১৯৯৯ মহেশখালী ভূমিকম্প
মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২। দ্বীপের বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কেন বাড়ছে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ চারটি সক্রিয় ফল্টলাইনের ওপর অবস্থিত
ডাউকি ফল্ট
আরাকান মেগাথ্রাস্ট
সিলেট মেঘালয় ফল্ট
চট্টগ্রাম টেকটনিক জোন
গত একশ বছর বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় এবং ফল্টলাইনের চাপ ক্রমাগত জমতে থাকায় বড় ধরনের কম্পন যে কোনো সময় ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
সূত্র:
বাংলাপিডিয়া
Eastern Bengal District Gazetteer
জেমস টেইলরের বিবরণ
ইতিহাসভিত্তিক ভূমিকম্প গবেষণা দল
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং ভূমিকম্পবিদদের তথ্যসংগ্রহ
বায়ান্ননিউজ২৪/সম্পাদক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.