‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইতিহাস’ বাদ দিচ্ছে সরকার
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (এনইউ) স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন একটি আবশ্যিক কোর্স চালু করেছে — ‘বাংলাদেশের ইতিহাস: ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়’।
এই কোর্সের অন্তর্ভুক্তির ফলে দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যসূচিতে থাকা ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ বিষয়টি আর পড়ানো হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই নতুন কোর্সটি ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ থেকেই কার্যকর হবে।
এটি স্নাতক (সম্মান) এবং প্রফেশনাল স্নাতক (সম্মান) উভয় প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন কোর্সের কাঠামো ও প্রয়োগ ক্ষেত্র
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রফেশনাল স্নাতক (অনার্স) প্রোগ্রামের মধ্যে বিএসসি ইন এএমটি, এফডিটি, কেএমটি, টিএসটি, বিবিএ (অনার্স) প্রফেশনাল, বিএসসি ইন ইসিই, সিএসই, মেরিন ফিশারিজ, মেরিন নটিক্যাল, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ড্রামা অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, বিএফএ (অনার্স), বি-মিউজিক (অনার্স) এবং বিএড (অনার্স) শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন এই কোর্সটি আবশ্যিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, নৃবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষকদের মাধ্যমে এ কোর্সটি পাঠদান করার নির্দেশনাও দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন কোর্সটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসকে ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আরও সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করা যাতে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র ও সমাজের বিবর্তন বুঝতে পারে এক সামগ্রিক কাঠামোয়।
‘অভ্যুদয় ইতিহাস’ বাদ পড়ায় বিতর্ক
তবে, কোর্স পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে একাডেমিক অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক সিনেট সদস্য বলেন,
“মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। সেই যুদ্ধের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে নতুন কোর্সের কাঠামো তৈরি করলে তা প্রজন্মকে তাদের মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।”
একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় যুক্ত এক গবেষক মনে করেন,
“এটি কেবল একটি পাঠ্যসূচি পরিবর্তন নয় — বরং স্বাধীনতার ইতিহাসকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক করার প্রক্রিয়া। সরকারের এই উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত একটি প্রবণতা বলে মনে হচ্ছে।”
আরও কয়েকজন শিক্ষক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস: ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়’ শিরোনামটি ইতিবাচক হলেও, এর মধ্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ও রাষ্ট্রগঠনের ঘটনাপ্রবাহ কতটা স্থান পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ইতিহাসবিদ বলেন,
“জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্সটি অনেকাংশে স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিক বিবরণ ছিল। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে রাষ্ট্রচেতনা, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি এবং ১৯৭১-এর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানত। নতুন কোর্সে সেই ঐতিহাসিক উপাদান যদি না থাকে, তবে সেটি একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে।”
অন্যদিকে, কারও কারও মতে,
“নতুন কোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে — ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান ও পরিচয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে — পড়ানো হলে তা শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক চিন্তায় সহায়তা করবে।”
প্রশাসনিক নীরবতা
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের ডিন অধ্যাপক এ এইচ এম রুহুল কুদ্দুস এবং উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহর সঙ্গে মঙ্গলবার ও বুধবার একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।
তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও এখনো প্রকাশিত হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিক্ষা নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের মূলভিত্তি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্কুল-কলেজের পাঠক্রমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অধ্যয়ন ক্রমেই কমছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি থেকে “স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস” বাদ যাওয়াকে অনেকে সেই ধারাবাহিকতার আরেক ধাপ হিসেবে দেখছেন।
শিক্ষা বিশ্লেষক কবির আহমদ মন্তব্য করেন,
“সরকার যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে চায়, তবে স্বাধীনতার ইতিহাসকে আরও গবেষণামূলকভাবে উপস্থাপন করা উচিত ছিল, বাদ দেওয়া নয়।”
বায়ান্ননিউজ২৪/আবির
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.