অদৃশ্য হাতের ইশারায়
পিতাকে বুঝে উঠতে পারে না হাসান। সে জানে তিনি একজন ডেমোক্রেট। গত নির্বাচনে বাইডেনের সমর্থনে সোচ্চার দেখেছে। ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক। আর এখন? হাসান কনফিউজড। পিতা মাঝে-মাঝে ট্রাম্পের রেফারেন্স টানেন। বাইডেনকে তার সমালোচনা শুনলে মনে হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে বলছেন।
খাবার টেবিলে এর সূচনা। বাড়ীর ইনসুরেন্সের চিঠি হাতে হাসান। হাসি খাম খোলার আগেই আমার আগ্রহ ঝরে পড়লো।
-এবার কত?
-৬৪৪।
পাঁচ বছর আগে ছিল পাঁচের নীচে। সব কিছু বাড়ছে হু হু করে।
কথায় কথা বাড়ে।
ভাবলাম বাড়াবো কিনা। চার পাশে কত বিষয়। দুবাইয়ে এক বাঙালির আলাদীনের চেরাগ। এক কপ কিলারের সোনার দোকান উদ্বোধন করেছেন এক সেলিব্রেটি ক্রিকেটার। তারেক জিয়ার এপিএসের মামলা লড়ছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য! আরো কত কি!
চোখ আমার টিভি পর্দায়। এইমাত্র শেষ হলো খেলা। আয়ারল্যান্ড হারলো। আমি মুগ্ধ অন্য কারণে। শুনেছি
লাক্কাতুরার সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়াম সবচেয়ে সুন্দর। পাখির চোখে তাই দেখছিলাম। পাহাড় আর সবুজে ঘেরা দৃষ্টিনন্দন মাঠ দেখে মনে হবে ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ার কোন শহরতলী।
না, আমাকে সে কথাতেই ফিরে যেতে হবে, যেখানে কথায় কথা বাড়ছে। কি কথা? বাড়ীর ইনসুরেন্স হু হু
করে বাড়ছে। এটাও কি যুদ্ধের ফসল?
বাইডেন সমর্থক হাসির উত্তর, বাড়ীর দাম বাড়ছে, তাই–।
ভাড়াও বাড়ছে। নব্বই দশকে যে ঘরের ভাড়া ছিল ছ' সাত, এখন ষোল সতেরো।
লোপা ম্যাকডোনাল্ড এনেছে। পানকেক, বিস্কিট, ডিম। পপুলার ব্রেকফাস্ট। বাক্স খুলে দেখি ডিম
অল্প, আগের অর্ধেক। লোপা বললো, এখন ডিমের ক্রাইসিস। লন্ডনে সবজী সংকট। টমেটোর কোটা, তিনটার বেশী নেয়া যাবে না।
চাইনিজ ব্রকলি চিকেন আর চার নয়, এখন আট ন' ডলার। বাঙালি বিরিয়ানি দশ ডলার।
হাসিকে বললাম, দুটো ট্রিপল 'এ' ব্যাটারী নাইন্টি নাইন দোকান থেকে আনবে। -ভুলে যাও, ওদিন বাসি
হয়েছে। নাইন্টি নাইন বলে কিছু নেই।
হাসান বললো, সেলুনে দশ ডলারের দিন শেষ। এখন পচিঁশ ডলার।
এ সব প্রতিদিনের কেচ্ছা। পৃথিবীটা বদলে গেছে। করোনা মহামারির মাঝেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
বছর পার হলো, থামছেই না। যুদ্ধে বেহাল দশা। বড় দেশগুলোরও রেহাই নেই। আমেরিকার পোশাকী নাম মূল্যস্ফীতি। মানে মূল্যবৃদ্ধি। কোন হইচই নেই। নিজের হাহুতাশ নিজের মাঝে। কে কার কথা শুনবে?
কমুক আর না কমুক, বাংলাদেশে স্লোগান মিছিল হয়, পোস্টার পড়ে। ষাট বছর আগে নিজে করেছি। 'কমাতে
হবে, কমাতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে।' না, কমেনি কখনো। তবে রাজনীতি হয়েছে। যার যার মতো। এক প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে দিনের সব নিউজ বুলেটিনে থাকে বাজার রিপোর্ট। জনগণের নাভিশ্বাস, নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, লাগাম নেই, উর্ধগতি ঊর্ধ্বগতি। রোজা-ঈদে মূল্যবৃদ্ধি এখন আর খবর নয়।
খবরে দেখলাম, কুয়েতে রমজান উপলক্ষে সব জিনিসের দাম কমানো হয়েছে। ওখানের বাঙালি ব্যবসায়ীরাও কমানোর মিছিলে সামিল হয়েছেন। আর বাংলাদেশে?’… না শোনে ধর্মের কাহিনী'। বাংলাদেশের ওই টিভি চ্যানেলের নাম হওয়া উচিত 'বাজার টি়ভি'। আমেরিকায় এ ধরনের একটি টি়ভি থাকলে মন্দ হতো না। কি হতো না হতো জানি না, তবে স্পন্সররা মুখ ফিরিয়ে নিতো, এটা নিশ্চিত।
এত ধ্বংস, এত মৃত্যুর পরও থামছে না যুদ্ধ। ইন্ধন আছে সব পক্ষে। মানবতা ভুলুন্ঠিত। বড়
বিপদ, যদি কেউ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে! কেয়ামত হয়ে যাবে।
হাসান এবার সরাসরি প্রশ্ন করলো, আব্বা, তুমি কি রাশিয়াকে সমর্থন করো?
বললাম, না। আমি যুদ্ধের বিপক্ষে। আমি এখনো বিশ্বাস করি, বাইডেন চাইলে এই যুদ্ধ থামাতে পারতেন।
এ প্রসঙ্গে দু'জনের কথা উল্লেখ করবো, একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অপরজন ফক্স টিভির হোস্ট টাকার কার্লসন। আমি তাদের কারো সমর্থক বা ভক্ত নই। পরিস্থিতি বুঝাতে তাঁদের কথা উল্লেখ করছি। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে এ যুদ্ধ হতে দিতেন না। টাকার কার্লসন বলছেন, রাশিয়ার সীমান্তে আমাদের কাজটা কি? আমাদের থাকতে হবে দক্ষিণের সীমান্তে (মেক্সিকো)।
রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটোকে নিয়ে যাওয়া কি আমাদের প্রধান কাজ?
আমেরিকার কাছে আমি ঋণী। আমি কৃতজ্ঞ। শুধু একটি উদাহরণ দিতে পারি। আমার চিকিৎসার কোটি টাকা বহন করছে এই রাষ্ট্র। আমার জীবনের সকল প্রয়োজন পূরণে পাশে আছে। নিজের নাগরিকদের এমন কল্যাণ আর কোন দেশ করবে কিনা জানি না। মন থেকে ভালোবাসি এ দেশকে। এক সময় সারা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা ছিল আমেরিকা। ছিল গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মুক্তি, মানবতার প্রতীক। তবে গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ পিছু ছাড়ছে না। ছোট জাতিরাষ্ট্রের কাছে আমরা বন্ধু নই, আতংক। কখন কার উপর যুদ্ধ বা অবরোধ নেমে আসে, কেউ জানে না। আমার দেশের এই নেতিবাচক পরিচিতি চাই না। যুদ্ধ বা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ধাকতে ভালোবাসেন আমাদের নেতারা। হোক না প্রক্সি ওয়ার!
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ এক গল্প মনে পড়লো। এক চোর, পুত্রদের বারণ ও বয়স হওয়ায় চুরিতে যেতে পারে না। তবে রাত হলেই তাকে চুরির নেশায় পেয়ে বসে। কি আর করা! দীর্ঘদিনের অভ্যাস,রাতে নিজের গোয়ালঘরের গরু বাইরে নিয়ে আসে, কিছু পরে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দুধের স্বাদ ঘোলে কি আর মিটে?
এ সপ্তাহের খবর, গত বছর বিশ্বে সবচেয়ে বেশী অস্ত্র রফতানি করেছে আমেরিকা। আর নম্বর ওয়ান
ক্রেতা হলো ভারত।
এবার অদৃশ্য হাতের কথায় আসি।
এই হাত কি অশুভ, অশরীরী!
'ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না '। হরহামেশা শিরোনাম হয়ঃ পর্দার আড়ালে, নেপথ্যে কারা, অদৃশ্য হাতের কারসাজি।
অদৃশ্য সবকিছু খারাপ নয়। ছবি বা নাটকে নেপথ্যের মানুষেরাই আসল। লেখক, পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, গায়ক,আলো,
শব্দ, রূপ সজ্জা নেপথ্যের শক্তি। অদৃশ্য হলেও এ শক্তি জ্ঞাত।
আলোচ্য 'অদৃশ্য' শু়ভ নয়। নৃশংস, ভয়াবহ। যেন পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত। দেখা যায় না, চেনা যায় না।চতুর।
সব কন্ট্রোল করে। অথচ কোন দায়িত্ব নেয় না। এই অপশক্তির হাত ধেকে আমাদের নিরাপদ থাকতে হবে। সম্প্রতি চীনের নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন, অদৃশ্য হাতের ইশারায় চলছে এ যুদ্ধ। তাই শেষটা জানা নেই কারো!
কি অমঙ্গলের কথা?
–লেখক নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.