বুলিং : একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা

প্রকাশিত: ১৯ মার্চ, ২০২৩ ০১:১১ (মঙ্গলবার)
বুলিং : একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা

 ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে সাইবার বুলিং এখন একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।ফেসবুক, ইনস্টিগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট আরও অনেক কিছু সহ সোশ্যাল মিডিয়া হলো একটি প্রাথমিক চ্যানেল, যার মাধ্যমে সাইবার বুলিং সংঘটিত হয়। যে কোন বুলিং-মানেই ‌অন্যকে আঘাত করা, অন্যের ক্ষতি করা। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাইবার বুলিংয়ের প্রকোপ দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে রিপোর্ট করেছে, তবে বাঙালি কমিউনিটিতে নিপীড়নের রিপোর্ট করার পরিসংখ্যানটা এখনো স্পষ্ট নয়। 

সাইবার বুলিরা সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যাপ, ফোরামে এবং আরও অনেক কিছুর মাধ্যমেই অন্যদের হয়রান করতে উপস্থিত হোন। তবে ব্যক্তিগত বুলিং সাধারণত ইন্টার্নেটের মাধ্যমে পাবলিক পোস্ট, মন্তব্য, ইমেল, টেক্সটিং বা সরাসরি মেসেজিংয়ের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। 

 

সাইবার বুলিং সাধারণভাবে পাঁচটি মানদণ্ডের আলোকে উদ্ভূত হয়, যেমন- উদ্দেশ্য, পুনরাবৃত্তি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, পরিচয় গোপন রাখা এবং প্রচার। আমাদের সব কাজের পিছনেই মূলত একটি বা একাধিক কারণ থাকে। সাইবার বা অনলাইনে জড়িত বুলিং-সাধারণত ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয়। যাইহোক, উদ্দেশ্য থাকুক বা না থাকুক, যে কোন বুলিংই ক্ষতিকর। 

পুনরাবৃত্তি-সাইবার বুলিংয়ের একটি বৈশিষ্ট্য। এটি উৎপীড়নের পক্ষ থেকে পুনরাবৃত্তিমূলক একটি ক্রিয়াকলাপ, যেখানে ইন্টার্নেটের মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য বা শেয়ার করা কিছু জনসম্মুখে প্রকাশ করার হুমকি থাকে। 

শক্তির ভারসাম্যহীনতা-সাইবার বুলিংয়ের অন্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে একটি। ভুক্তভোগীরা প্রায়শই তাদের উৎপীড়নের জ্বালায় সাহস ও ক্ষমতার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে জনসম্মুখের হয়রানিতে। বেনামী সাইবার বুলিরা নিজেদের আসল পরিচয় লুকানোর জন্য ছদ্মনামে অন্যদের বুলিং করে। কিছু সাইবার বুলিংয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, এতে প্রচারের ব্যবহার জড়িত। প্রকাশ্যে কাউকে অপমান বা অপদস্ত করে কেউ কেউ নিজেদের শক্তিশালী মনে করে থাকেন। 

কেন মানুষ সাইবার বুলিং করে-এর নির্দিষ্ট কোনো একটি  কারণ নেই। এর পিছনে অনেকগুলি বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যা কাউকে সাইবার বুলিতে পরিণত করে। তারমধ্যে একটি হলো-মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। 

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে জীবনযাপন করাদের অনেকের মাঝে কোনো কোনো সময় সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যখন তাদের মাঝে আগ্রাসন, হাইপার অ্যাক্টিভিটি বা আবেগপ্রবণতা, পদার্থের অপব্যবহারের সমস্যাগুলি জড়িত থাকে, তখন বুলিং এর ব্যাপারটি আরো খারাপ দিকে যেতে পারে। এছাড় যাদের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি, নার্সিসিজম বা সাইকোপ্যাথির "Dark tetrad" অর্থাৎ বর্বরতাকে উপভোগ করার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ থাকে, তারা সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকিতে থাকে। আবার নির্যাতনের শিকার হওয়া বুলিরাও কখনও কখনও নিজেরাই সাইবার বুলিংয়ে জড়িয়ে যায়। নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং শিকার হওয়ার পরে আসল বুলির প্রতি প্রতিশোধ নিতে না পারার যন্ত্রণা থেকেও অনেকে, অন্যকে বুলিং করার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়। এভাবেই নিজেদের রাগ-ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে করতে চায় অনেকে। 

 

একঘেয়েমি থেকে বা নতুন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের চেষ্টা করার আকাঙ্ক্ষার কারণেও কেউ সাইবার বুলিংয়ে জড়িত হতে পারে। ব্যক্তিজীবন ও সমাজে বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব বোধের সাথে লড়াই করা ব্যক্তিরাও বুলিংয়ে জড়িত হতে পারেন। কারণ তারা অন্যদের দ্বারা উপেক্ষা করা বোধ করেন এবং ভাল বোধ করার বা সমাজে তাদের ক্রোধ প্রকাশ করার উপায় হিসাবে বুলিং একটি মাধ্যম হয়ে দেখা দেয়। তবে ফেসবুকে বর্তমানে যে ধরনের পোস্ট, মন্তব্য ও মেসেজের মাধ্যমে বুলিং করা হয়, তার কারণ হতে পারে ঈর্শা ও প্রতিশোধ স্পৃহা। সম্পর্কে দ্বন্দ্ব বা ভাঙনের ফলে দেখা যায়। পূর্বে বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের মধ্যে থাকা দুই ব্যক্তির মধ্যেও সংঘটিত হয় বুলিং-অর্থাৎ একে অন্যকে হয়রান করা। এই ধরনের বুলিং সাধারণত ফেইক আইডিতে বেশি হয়। 

আবার এমন অনেকেই আছেন যারা ব্যক্তিজীবনে বা সবার সাথে খুব সহজ ও নমনীয় হোন কিন্তু নির্দিষ্ট কারো প্রতি বুলিংয়ে জড়িত হোন। এটা হতে পারে ব্যক্তি দ্বন্দ্ব বা কারো সৌন্দর্য, খ্যাতি, সাফল্য অর্জনে সহনশীন হতে না পারা থেকে। তাদের মাঝে নিজেকে সর্বাবস্থায় উন্নত ও সেরা ভাবার একটা প্রবণতা থাকে। এসব বুলিং ফেইক আইডি থেকেই করা হয়। এবং বুলিরা ভাবেন, তাদের কটু মন্তব্য, আচরণে শিকারীরা হার মেনে যাবে বা পরাজিত হবে, আর সেটা করতে পারলে তারা আনন্দ অনুভব করেন। 

 

 

যারা সাইবার বুলিং বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বুলিং করে আনন্দ পান, কিংবা প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হোন, তারা কখনোই ভাবেন না যে এখানে একজন ভিক্টিমের মানসিক অবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিজীবনের ঘটনা, লড়াই ভিন্ন। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসেন ক্ষণিকের বিনোদন বা স্ট্রেসমুক্ত হয়ে স্বাচ্ছন্দের জন্য। তারপর তাদের যখন বুলিংয়ের শিকার হতে হয়, সেটা মারাত্মকভাবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিজীবনে নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলে। যেমন : কষ্টের অনুভূতি বৃদ্ধি, হতাশা এবং মেজাজ পরিবর্তনের অনুভূতি বৃদ্ধি, উদ্বেগের অনুভূতি বৃদ্ধি, আত্মঘাতী ধারণা বা আত্মহত্যার চেষ্টা, ভয়ের অনুভূতি বৃদ্ধি, আত্মসম্মান বা স্ব-মূল্যবোধের অনুভূতি নষ্ট হওয়া, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাডেমিক ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হওয়া, পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়া, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসের লক্ষণ বৃদ্ধি, আত্ম-ক্ষতি (যেমন, কাটা, নিজেকে আঘাত করা এবং পদার্থ অপব্যবহারসহ রাগ) এবং বিরক্তি বা আক্রোশের অনুভূতি বেড়ে যাওয়া। 

 

সাইবার বুলিং যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘটে থাকে, সেটা থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয়। বুলিং যুগ যুগ ধরে চলছে, চলতেই থাকবে। এসব বুলিং ভুক্তভোগীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। তাই সমাধান বলতে নিজেকে বিভিন্ন উপায়ে এডজাস্ট করে নেয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো দ্বারা পোস্ট, কমেন্ট, মেসেজের মাধ্যমে বুলিং হলে সেইসব স্ক্রিনশটগুলো প্রমাণস্বরুপ জমা করে রাখা যায়। কথোপকথনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যায়। সমাধান না হলে সেইসব প্রমাণ নিয়ে পুলিশ রিপোর্ট করা যায়। কিংবা সহজ উপায় হলো ইগনোর করা বা আইডিতে হয়রানির অভিযোগ করে ব্লক করে রাখা। 

বাইরের দেশের স্কুলগুলো হলো অভিভাবকদের জন্য যোগাযোগের বিন্দু যেখানে বাচ্চাদের সাইবার বুলিং মোকাবেলা করতে সাহায্য করার চেষ্টা করা হয়। তবে স্কুলগুলোতে অবিলম্বে এবং দ্রুত সাইবার বুলিং মোকাবেলা করার জন্য প্রোগ্রাম এবং প্রোটোকল থাকা উচিত৷ আর যদি আপনি মনে করেন যে, বুলিংয়ের শিকার হয়ে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে, তাহলে বিকল্প হিসাবে আলোচনা করার জন্য আপনি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। 

আপনি যদি বুলিং করে থাকেন, বা অন্যদের প্রতি আপনার কম সহানুভূতি থাকে বা সাইকোপ্যাথির কোন বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা হয়, তাহলে অন্তর্দৃষ্টি এবং পরিবর্তন খুঁজে পাওয়া আপনার পক্ষে কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে আপনি আপনার শক্তিকে বিভিন্ন সাধনায় চালিত করার চেষ্টা করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি কাউকে সাইবার বুলিং করে থাকেন কারণ এটি আপনাকে আনন্দ বা সুখ দেয়, তাহলে আপনি বিকল্প হিসাবে এমন কিছু খুঁজে নিতে পারেন, যা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং আপনাকে একই আনন্দ ও সুখ দিবে। এছাড়া বুলিংংয়ের বিরুদ্ধে কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান হওয়া উচিত এবং অনলাইন বুলিং যে গ্রহণযোগ্য নয়, এটি যে একটি দুর্বল সামাজিক অবস্থার লক্ষণ-সেটা নিয়ে আওয়াজ তোলা দরকার। 

এডিটর ইন চীফ: গোলাম রসুল খান

মোবাইল: +447538476881

তথ্য ও প্রযুক্তি সহযোগী - আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.