দক্ষতাই সাফল্যের ভিত
দক্ষতা হল যে-কোনো ধরনের সাফল্যের ভিত। খেলাধূলা, পড়াশোনা, গানবাজনা যাই হোক না কেন কারও ক্ষেত্রে তা আসে সচেতনভাবে আবার কারও ক্ষেত্রে পরিবেশের সঙ্গে রড়াই করে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনতে হয় অনেককেই। কোন লক্ষ্যে এগোবেন তা ঠিক করার অর্থ হল লক্ষপূরণের শর্তগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া। অর্থাৎ, যে পেশায় যেতে আগ্রহী সেই পেশার জন্য কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন, সেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, উক্ত পেশার জন্য সহজাত গুণগুলো নিজের মধ্যে আদৌ আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে নিজেকে।
এক্ষেত্রে অভিভাবকদের কাজ গাইড করা, নিজেদের ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত করা নয়। রক্ত দেখলে যার বুক দুরুদুর করে তাকে ডাক্তারি পেশার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বা যে ছেলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও দিন ক্রিকেট বা ফুটবলে আগ্রহ দেখায়নি তাকে সাকিব বা মুস্তাফিজ বানানোর স্বপ্ন দেখানো বৃথা। বাস্তবে সফল হওয়ার বীজটা লুকিয়ে থাকে প্রত্যেকেরই বাড়ির পরিবেশ, শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানসহ পারিপার্শ্বিক পরিবশের উপর কারণ, টলমল পায়ে হাঁটতে শেখার পর শিশুর মুখে বুলি ফোটে। আর, স্ইে সঙ্গে বাড়তে থাকে জানার আগ্রহ। বড়দের কাছে তা হাস্যাসম্পদ হলেও শৈশবের সেই জিজ্ঞাসার উত্তর মেলাটা কিন্তু খুব জরুরি। আকাশ কেন নীল, রাত কেন হয়, বাবা কেন অফিসে যায়, বৃষ্টি কেন পড়ে-এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বড়দের কাছে সহজ হলেও বাচ্চাদের কাছে সহজ করে বর্ণনা করাটা কিন্তু সকলের কাছে অতটা সহজ নয়।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য্য ডক্টর ওসমান গণী বলেছিলেন, সফল হতে হলে সারা জীবন ছাত্র হয়ে থাকো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি কর্মক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতন কর্তাকে প্রশ্ন করার অভ্যাসটা যেন কোনো দিন চলে যায়-না। কিন্তু কতজনই বা পারে জীবনভর ছাত্র হয়ে থাকতে। একটু বড় হতেই হারিয়ে যায় প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা। মনের মধ্যে বাসা বাঁধে ভয়ভীতি, হীনম্মন্যতা। আমি বোধহয় কোনও ভুল, হাস্যকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফেলছি। লক্ষ্য ভেদের লক্ষ্যে এগোতে চাইলে আড়ষ্ঠতা কাটাতে হবে। ‘লোকে কী ভাবল’ তা ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে।
ক্লাসের ফাস্ট বয় বোর্ডের রেজাল্ট দুর্দান্ত, ইচ্ছে ছিল পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্থাৎ গষেবণা। নিজের প্রচেষ্টা ও বাবা-মায়ের ইন্ধনে সাকার হল সব কিছুই। বিদেশে সেটেলড আবার অন্য একটা উদাহরণ। এই ছেলেটিও ক্লাসের প্রথম সারির একজন। ইংরেজিতে চোস্ত। দুর্দান্ত রেজাল্টের জোরে দেশের প্রথম সারির মেরিন কলেজে ঠাঁই করে নিল কিন্তু বিধি বাম। কর্মক্ষেত্রে চুড়ান্ত অসফল। ‘পানি শুধু পানি’ দেখে সত্যিই চিত্ত বিকল হয়ে পড়ল। অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা দেখে চাকরি ছাড়িয়ে অভিভাবকরা শরণাপন্ন হলেন শহরের নামী মনোবিদের । প্রাথীর খোলনলচে জেনে তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেটি প্রকৃতপক্ষে ইংরেজি সাহিত্যের একনিষ্ঠ ভক্ত। মা-বাবাকে মনঃক্ষুন্ন না-করার জন্যই মেরিনে পা বাড়িয়েছিল মুখচোরা মেধাবী ছাত্রটি তার পরিণতি এটা। এমন ঘটনা আকছারই ঘাটে।
লক্ষ্যে পৌঁছতে না-পারলেই অবসাদ, তারপর আত্মহনন কিন্তু, জানতে হবে লক্ষ্যটা কার? সন্তানের, না তার অভিভাবকের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, অভিভাবকের ইচ্ছেকে বাস্তবায়িত না-করার খেসারত দিতে হচ্ছে ছাত্রকে। আদতে আধুনিক মনোবিদ্যাতেও কেরিয়ারের ক্ষেত্রে সফল এবং প্রতিষ্ঠিত এই দুই শব্দের আভিধানিক অর্থ কাছাকাছি হলেও বাস্তবের প্রেক্ষিতে দুরত্ব কয়েক যোজন। বিএসসি, এমএসসি করে তারপর স্কুল-কলেজের শিক্ষকতা পেলে অনেকেই সন্তুষ্ট, সফল বা প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করেন আবার, আইআইটি বা আইআই‘তে পড়ে বহু জাতিক সংস্থায়-উচ্চপদে থেকেও খুঁতখুঁতে থেকে যান অনেকেই। অঢেল টাকা থুড়ি ডলার কামালেও আরও উপরে উঠার তাগিদ তাঁদের সাফল্যের তকমাতে সীমাবদ্ধ থাকতে দেয় না। আর্থিক প্রতিপত্তি, সামাজিক মর্যাদা সব কিছুর চুড়ায় না উঠলে অধরা থেকে যায় সাফল্য, প্রতিষ্ঠিত এসব কথাগুলো। অনেক সময় সাফল্যের মরীচিকা এই ‘সফল’-দের ধরা দেয় না।
আশপাশের স্বজন-বন্ধুদের কাছে একসঙ্গে সফল ও প্রতিষ্ঠিত বলে গণ্য হলেও সে নিজের কাছে কোনটিই নয় কারণ উচ্চাশার কোনও সীমা নেই। লক্ষ্যভেদ করেও সে ঠিক করে নেয় আর একটি লক্ষ্য কিন্তু সে যে লক্ষ্যভেদটি করেছে সেটি আদৌ তার মনঃপুত কিনা, সে প্রশ্নের জবাব সে নিজেও খোঁজে না। টাকা রোজগারের যন্ত্রে পরিণত হয়ে কখন সে নিজের জীবনের ইচ্ছে অনিচ্ছাকে এক করে ফেলেছে, তা সে নিজেই জানে না। এক সময় হয়তো তাঁর সহজাত দক্ষতা কম্পাসের কাঁটাটি দক্ষিণ দিকে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে বা বাবা-মা জোর করে সেটিকে পূর্বমুখী করে দিয়েছে। ভেড়ার দলে পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং আর ডাক্তারি ছাড়া কোনও কেরিয়ার-এর কথা তার কানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। স্রোতের বিপরীতে সাঁতারেও লক্ষ্যভেদ করা যায় এমন মন্ত্র শৈশবে ঢুকিয়ে দিলে হীনম্মন্যতা বা ব্যর্থতার লেভেল লাগার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.